সাময়িক প্রসঙ্গ
আল্লাহ যাদের সাথে কথা বলবেন না
আবূ তাহসীন মুহাম্মদ

রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর অমিয় বাণী

عَنْ أَبِيْ ذَرٍّ، عَنِ النَّبِيِّ (ﷺ) قَالَ : ثَلَاثَةٌ لَا يُكَلِّمُهُمُ اللهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، وَلَا يَنْظُرُ إِلَيْهِمْ وَلَا يُزَكِّيْهِمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ .قَالَ : فَقَرَأَهَا رَسُوْلُ اللهِ (ﷺ) ثَلَاثَ مِرَارًا، قَالَ أَبُوْ ذَرٍّ : خَابُوْا وَخَسِرُوْا، مَنْ هُمْ يَا رَسُوْلَ اللهِ؟ قَالَ : الْمُسْبِلُ، وَالْمَنَّانُ، وَالْمُنَفِّقُ سِلْعَتَهُ بِالْحَلِفِ الْكَاذِبِ.

সরল অনুবাদ

আবূ যার (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি রাসূল (ﷺ) হতে বর্ণনা করেন। রাসূল (ﷺ) বলেন তিন প্রকার মানুষের সাথে আল্লাহ তা‘আলা কিয়ামতের ভয়াবহ দিনে কথা বলবেন না। তাদের দিকে (রহমতের দৃষ্টিতে) তাকাবেন না এবং তাদেরকে পবিত্র করবেন না। আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। রাসূল (ﷺ) তার একথাটি তিনবার বললেন। আবূ যার (রা.) বললেন : ধ্বংস এবং ক্ষতিগ্রস্ত তারা কারা হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)? আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেন, ১ম প্রকার মুসবিল অর্থাৎ-যারা টাখনুর নিচে পরনের বস্ত্র ঝুলিয়ে পরিধান করে। ২য় প্রকার মান্নান অর্থাৎ- যারা দান করে দানের কথা বলে খোটা দেয়। ৩য় প্রকার যারা মিথ্যা শপথের মাধ্যমে তার পন্য বিক্রয় করে।[১]

হাদীসের রাবীর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

নাম ও পরিচিতি : তাঁর নাম জুনদুব ইবনু জুনাদাহ/বুরাইয়া। উপনাম আবূ যর। এ নামেই তিনি সমধিক পরিচিত ছিলেন। পিতার নাম জুনাদাহ। গিফার গোত্রের লোক হিসেবে তাঁকে আল গিফারী বলা হয়।

জন্মগ্রহণ : তাঁর জন্ম তারিখ সম্পর্কে সঠিক কোনো তথ্য জানা যায়নি। তবে তিনি জাহেলী যুগের কোনো এক সময়ে জন্মগ্রহণ করেন।

ইসলাম গ্রহণ : তিনি রাসূল (ﷺ)-এর আগমনের সংবাদ পেয়ে মক্কায় গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। মানাযির আহসান গিলানী তাঁকে ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে পঞ্চম বলে উল্লেখ করেছেন। আবূ যর গিফারী নিজেই তাঁর ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে বলেন, যাঁরা সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেছিল আমি তাদের চার জনের মধ্যে চতুর্থ, কিন্তু সিয়ার প্রণেতাগণ তাঁকে পঞ্চম মুসলমান বলে অভিহিত করেছেন।

জিহাদে অংশগ্রহণ : বদর, উহুদ, খন্দক প্রভৃতি যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পর পঞ্চম হিজরিতে তিনি মদিনায় আগমন করেন। তবে তিনি তাবুক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন।

রাসূল (ﷺ)-এর সাহচর্য ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন : মদিনায় অবস্থানকালে তিনি সর্বক্ষণ রাসূল (ﷺ)-এর খিদমতে নিয়োজিত থাকতেন। রাসূল (ﷺ) তাঁকে মুনযির ইবনু আমরের সাথে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করে দেন। ‘যাতুর রিকা’ যুদ্ধে যাত্রাকালে রাসূল (ﷺ) তাঁকে মদিনার আমীর নিযুক্ত করেন।

বাসস্থানের রদবদল : জীবনের শেষ বয়সে তিনি কয়েকটি স্থান রদবদল করেন। যেমন-‘উমারের খেলাফতকালে মদিনায়, ‘উসমানের খেলাফতকালে সিরিয়ায়, মু‘আবিয়ার সাথে সম্পদ পুঞ্জীভূত করার মাসয়ালায় বিরোধ হলে পুনরায় সিরিয়া ছেড়ে মদিনায় চলে যান। অতঃপর মদিনার ‘রাবাযা’ পল্লীতে আমরণ নির্জনে বসবাস করেন।

গুণাবলি : তিনি একজন সাধক, কোমলমতি ও অমায়িক লোক ছিলেন। মিতব্যয় এবং সংযম ছিল তাঁর অনন্য বৈশিষ্ট্য। তিনি ইসলামের প্রথম মুবাল্লিগ ছিলেন।

হাদীসশাস্ত্রে অবদান : তিনি রাসূল (ﷺ) থেকে সর্বমোট ২৮১টি হাদীস বর্ণনা করেছেন। এর মধ্যে ৩১টি হাদীস ইমাম বুখারী ও মুসলিম যৌথভাবে উল্লেখ করেন। এককভাবে ইমাম বুখারী ২টি এবং ইমাম মুসলিম ১৭টি হাদীস নিজ নিজ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন।

মৃত্যু : এ মহান সাহাবী ‘উসমান (রা.)-এর খেলাফতকালে ৩২ হিজরির ৮ যিলহজ্জ মদিনা থেকে ৪০ মাইল দূরে ‘রাবাযা’ নামক পল্লীতে মৃত্যুবরণ করেন। ‘আব্দুল্লাহ ইবনু মাস‘ঊদ (রা.) তাঁর জানাযায় ইমামতি করেন। তাঁকে ‘রাবাযা’ নামক পল্লীর নির্জন প্রান্তরেই সমাহিত করা হয়।

হাদীসের ব্যাখ্যা

তিন প্রকার মানুষের সাথে আল্লাহ তা‘আলা কিয়ামতের ভয়াবহ দিনে কথা বলবেন না। তাদের দিকে রহমতের দৃষ্টিতে তাকাবেন না এবং তাদেরকে পবিত্র করবেন না। আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। তাদের ১ম প্রকার হলো যারা টাখনুর নীচে কাপড় পরিধান করেন।

পোশাক মানুষের জন্য আল্লাহ তা‘আলার দেওয়া একটি নিয়ামত। এর মাধ্যমে মানুষের সৌন্দর্য ও ব্যক্তিত্বের প্রভাব ফুটে ওঠে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿يَا بَنِيْ آدَمَ قَدْ اَنزَلْنَا عَلَيْكُمْ لِبَاسًا يُوَارِيْ سَوْءَاتِكُمْ وَرِيْشًا وَلِبَاسُ التَّقْوَىَ ذٰلِكَ خَيْرٌ ذٰلِكَ مِنْ آيَاتِ اللهِ لَعَلَّهُمْ يَذَّكَّرُوْنَ﴾

“হে বানী আদম! তোমাদের লজ্জাস্থান ঢাকার ও বেশ-ভূষার জন্য আমি তোমাদের পরিচ্ছদ দিয়েছি এবং তাক্বওয়ার পরিচ্ছদ; এটাই সর্বোৎকৃষ্ট। এটা আল্লাহর নিদর্শনমূহের অন্যতমÑ যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে।”[২]

পোশাক পরিধানের ক্ষেত্রে শালীনতার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছে ইসলাম এবং এ বিষয়ে বিভিন্ন বিধি-নিষেধের কথাও জানিয়েছেন রাসূল (ﷺ)।

আল্লাহ তা‘আলার নিকট পায়ের গোড়ালীর নীচে কাপড় পরিধান করা বড়ই গুনাহের কাজ, অথচ লোকজন এই বড় গুনাহকেও তুচ্ছজ্ঞান করে সর্বদা তাদের পড়নের প্যাণ্ট, পায়জামা, লুঙ্গি, ট্রাওজার পায়ের গোড়ালীর নীচে ঝুলিয়ে রাখে। কারো কারো কাপড়তো আবার মাটিও স্পর্শ করে। পরনের কাপড় গোড়ালীর উপর পরাকে লজ্জাজনক মনে করে। যে ব্যক্তি বলে যে, আমার পরিধানের কাপড় গোড়ালির নিচে গেলেও তা অহংকারবশত নয়। সে প্রকৃতপক্ষে নিজের আত্নার প্রশংসা করছে যা কোনো মতেই গ্রহণীয় নয়। শাস্তির ঘোষণা হলো আম বা ব্যাপ্ত, কেউ অহংকারবশত করুক বা নাই করুক। যেমন-রাসূল (ﷺ) বলেন,

عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ (رَضِيَ اللهُ عَنْهُ)، عَنِ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ : مَا أَسْفَلَ مِنَ الكَعْبَيْنِ مِنَ الْإِزَارِ فَفِيْ النَّارِ.

আবূ হুরাইরাহ্ (রা.) বলেন, রাসূল (রা.) বলেন, পরিধানের কাপড় পায়ের গোড়ালীর নীচে যে পরিমাণ যাবে, সে পরিমাণ জাহান্নামে যাবে।[৩]

আর যদি কেউ অহংকারবশতঃ কাপড় ঝুলায় তাহলে তার শাস্তি হবে আরো কঠোর এবং ভয়াবহ যেমনটি নবী করীম () বলেছেন,

عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ (ﷺ) قَالَ : لَا يَنْظُرُ اللهُ يَوْمَ القِيَامَةِ إِلَى مَنْ جَرَّ إِزَارَهُ بَطَرًا.

আল্লাহ তা‘আলা কিয়ামতের দিন সেই ব্যক্তির দিকে দৃষ্টি দিবেন না যে অহংকারবশতঃ তার পড়নের বস্ত্র টাখনুর নীচে ঝুলিয়ে পরিধান করে।[৪]

অন্য একটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে,

وَعَنْ أَبِيْ سَعِيْدٍ الْخُدْرِيِّ (رَضِيَ اللهُ عَنْهُ) قَالَ : سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ (ﷺ) يَقُوْلُ : إِزْرَةُ الْمُؤْمِنِ إِلَى نِصْفِ السَّاقِ، لَا جُنَاحَ عَلَيْهِ فِيْمَا بَيْنَهُ وَبَيْنَ الْكَعْبَيْنِ مَا أَسْفَلَ مِنْ ذٰلِكَ فَفِيْ النَّارِ, قَالَ ذٰلِكَ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ وَلَا يَنْظُرُ اللهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِلَى مَنْ جَرَّ إِزَارَهُ بَطَرًا.

আবূ সা‘ঈদ খুদরী (রা.) হতে বণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল ()-কে বলতে শুনেছি, মু’মিনের কাপড় থাকবে তার অর্ধগোছা পর্যন্ত, তবে টাখনু ও গোছার মাঝামাঝি থাকলে কোনো দোষ নেই। কাপড় টাকনুর যে পরিমাণ নীচে যাবে, সে পরিমাণ জাহান্নামে যাবে। কথাটি রাসূল () তিন বার বলেছেন। যে ব্যক্তি অহংকারবশত পায়ের গোড়ালীর নীচে কাপড় পড়বে আল্লাহ তা‘আলা তার দিকে কিয়ামতের দিনে রহমতের দৃষ্টিতে তাকাবেন না।[৫]

২য় প্রকার- যারা দান করে খোটা দেয় : ইসলামে পরোপকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটা ঈমানের দাবি এবং আল্লাহ তা‘আলার অত্যন্ত পছন্দনীয় কাজ। দান করা আল্লাহ তা‘আলার ‘ইবাদতগুলোর অন্যতম একটি ‘ইবাদত এবং সৎকর্মপরায়ন বান্দার ভালো গুনাবলী। একজন ব্যক্তি কম বেশি ছোট-বড় যা কিছুই সে দান খয়রাত করে তা আল্লাহ তা‘আলা লিপিবদ্ধ করেন, বিনিময়ে তিনি তাকে উত্তম প্রতিদান দিবেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :

﴿وَلَا يُنْفِقُوْنَ نَفَقَةً صَغِيْرَةً وَلَا كَبِيْرَةً وَلَا يَقْطَعُوْنَ وَادِيًا إِلَّا كُتِبَ لَهُمْ لِيَجْزِيَهُمُ اللهُ أَحْسَنَ مَا كَانُوْا يَعْمَلُوْنَ﴾

“আর ছোট-বড় যা কিছু তারা ব্যয় করে এবং যত প্রান্তর অতিক্রম করে তা তাদের জন্য লিখিত হয়, যেন আল্লাহ তাদের কৃতকর্মসমূহের উত্তম বিনিময় প্রদান করেন।”[৬]

আল্লাহ তা‘আলা বান্দার সে দান খয়রাতকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়ে থাকেন যেমন বিভিন্ন আয়াতে বলেছেন। কিন্তু আল্লহ তা‘আলার পক্ষ হতে দান খয়রাতের উত্তম বিনিময় এবং তা বহুগুণে বাড়িয়ে পাওয়া তখনই সম্ভব যখন দানকারী তার দানের মাধ্যমে কোনো অবস্থাতেই দানগ্রহীতাকে কষ্ট দিবে না এবং খোঁটা দিবে না। যেমন-আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿الَّذِيْنَ يُنْفِقُوْنَ أَمْوَالَهُمْ فِيْ سَبِيْلِ اللهِ ثُمَّ لَا يُتْبِعُوْنَ مَا أَنْفَقُوْا مَنًّا وَلَا أَذًى لَهُمْ أَجْرُهُمْ عِنْدَ رَبِّهِمْ﴾

“যারা আল্লাহর পথে নিজেদের ধন-সম্পদ ব্যয় করে, তৎপর যা ব্যয় করে তজ্জন্য কৃপা প্রকাশ করে না, কষ্ট দানও করে না, তাদের জন্য তাদের প্রভুর নিকটে পুরুস্কার রয়েছে।”[৭]

এ আয়াতে জানানো হচ্ছেÑআল্লাহর পথে কৃত ব্যয়ের সুফল লাভের জন্যে শর্ত হলো, পরবর্তীকালে সেই দানের জন্য কোনোরূপ খোঁটা না দেওয়া এবং কোনো কষ্ট না দেওয়া। বলা বাহুল্য, কোনো দান আল্লাহর পথে হয় তখনই, যখন তাতে ইখলাস থাকে। তাহলে এই আয়াত দ্বারা বোঝা গেল, কেবল দানকালীন ইখলাসই যথেষ্ট নয়; বরং দানের পরও ইখলাস রক্ষা জরুরি। খোঁটা দেওয়া ইখলাসের পরিপন্থী। কেননা খোঁটা দেওয়াই হয় পার্থিব প্রত্যাশা পূরণ না হলে।

খোঁটা দ্বারা কেবল দান-খয়রাত ও পরোপকারের সওয়াবই নষ্ট হয় না; বরং এটা একটা কঠিন পাপও বটে। কেননা এর দ্বারা উপকৃত ব্যক্তির অন্তরে আঘাত দেওয়া হয়। মানুষের মনে আঘাত দেওয়া কবীরা গুনাহ। সুতরাং খোঁটা দেওয়া ইসলাম ও ঈমানের সংগে সংগতিপূর্ণ নয়। কেননা মুসলিম তাকেই বলা হয় যার হাত ও মুখ থেকে সকল মুসলিম নিরাপদ থাকে।[৮]

আর মু’মিন সেই, যার ক্ষতি থেকে সকল মানুষ নিরাপদ থাকে[৯]। এজন্যেই খোঁটা দেওয়াকে কুরআন মাজীদে কাফির-বেঈমানের কাজ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছ। ইরশাদ হয়েছে-

﴿يَا اَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا لَا تُبْطِلُوْا صَدَقَاتِكُم بِالْمَنِّ وَالْأذَى كَالَّذِيْ يُنفِقُ مَالَهُ رِئَاء النَّاسِ وَلَا يُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَمَثَلُهُ كَمَثَلِ صَفْوَانٍ عَلَيْهِ تُرَابٌ فَاَصَابَهُ وَابِلٌ فَتَرَكَهُ صَلْدًا لاَ يَقْدِرُوْنَ عَلٰى شَيْءٍ مِّمَّا كَسَبُوْا وَاللهُ لَا يَهْدِيْ الْقَوْمَ الْكَافِرِيْنَ﴾

“হে মু’মিনগণ! দানের কথা বলে বেড়িয়ে এবং ক্লেশ দিয়ে তোমরা তোমাদের দানকে ওই ব্যক্তির ন্যায় নিষ্ফল করো না, যে নিজের ধন লোক দেখানোর জন্য ব্যয় করে থাকে এবং আল্লাহ ও আখিরাতে ঈমান রাখে না। তার উপমা একটি মসৃণ পাথর, যার ওপর কিছু মাটি থাকে। অতঃপর তার ওপর প্রবল বৃষ্টিপাত ওকে পরিষ্কার করে রেখে দেয়। যা তারা উপার্জন করেছে, তার কিছুই তারা তাদের কাজে লাগাতে পারবে না। আর আল্লাহ কাফির সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না।”[১০]

খোঁটা দেওয়া কাফিরদেরই বৈশিষ্ট্য। তারা যেহেতু আখিরাতে বিশ্বাস করে না, তাই সওয়াবেরও কোনো আশা থাকে না। আশা থাকে কেবল নগদপ্রাপ্তি। হয় সে ব্যক্তি তাকে আরও বেশি দেবে, নয় তার অনুরূপ উপকার তারও করবে। অন্ততপক্ষে তার গুণগান করে তো বেড়াবেই। যখন এর কোনোটা পায় না, তখন মনে করে- বৃথাই টাকা—পয়সা নষ্ট করল। এভাবে সে হতাশার শিকার হয় আর নিমকহারাম, অকৃতজ্ঞ ইত্যাদি বলে গালাগাল করে। এখন মু’মিন-ব্যক্তিও যদি খোঁটা দিয়ে বসে, তবে তা কাফিরসুলভ আচরণই হলো। এর দ্বারা প্রমাণ হবেÑ দান বা উপকার করার সময় মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি তার উদ্দেশ্য ছিল না।

খোঁটা দেওয়া একরকম অহমিকাও বটে। কারণ এর দ্বারা সে যাকে উপকার করেছে, তাকে নিজ কৃপাধন্য মনে করে। তাকে হীন ও ছোটভাবে। অথচ দান—উপকার করা চাই ব্যক্তির মান—সম্ভ্রমের প্রতি লক্ষ্য রেখেই। এমনকি আল্লাহ তা‘আলার কাছে বিশেষ কোনো ‘আমলের কারণে সে তার মতো বহু দান—খয়রাতকারী অপেক্ষা উচ্চ মর্যাদা রাখে। তাই উপকার করা উচিত সেবার মানসিকতা নিয়ে। অত্যন্ত বিনয় ও নম্রতার সাথে। ভাবা উচিত তাকে উপকার করে প্রকৃতপক্ষে নিজে উপকৃত হচ্ছে। দান—উপকার গ্রহণ করে সে তাকে মহান আল্লাহর কাছে বিপুল মর্যাদালাভের সুযোগ করে দিচ্ছে। যেই উপকারের সাথে এরকম মানসিকতা থাকে, খোঁটা দেওয়ার মতো হীনতা তাকে স্পর্শ করতে পারে না।

আসলে খোঁটা দেওয়া একরকম ধৃষ্টতা। কারণ মানুষ খোঁটা কেবল তখনই দেয়, যখন উপকার করতে পারাকে নিজ কৃতিত্ব গণ্য করে, মহান আল্লাহর দান ও তাওফীক্বের দিকে দৃষ্টি না থাকে। কেবল সামর্থ্য ও ক্ষমতা থাকলেই তো উপকার করা যায় না। এর জন্য মহান আল্লাহর তাওফীক্বের দরকার হয়। দান করার পরে খোঁটা দিলে সেই তাওফীক্বের অমর্যাদা করা হয় এবং করা হয় অকৃতজ্ঞতা। এই অকৃতজ্ঞতা ও ধৃষ্টতার কারণেই তো কিয়ামতের দিন সে আল্লাহ তা‘আলার সুদৃষ্টি, সুবাক্য ও পরিশোধন থেকে বঞ্চিত থাকবে এবং তাকে ভোগ করতে হবে কঠিন শাস্তি।

৩য় প্রকারÑ যারা মিথ্যা শপথের মাধ্যমে তার পন্য বিক্রয় করে : মিথ্যা মানবতাবোধকে লোপ করে, নৈতিক চরিত্রের অবক্ষয় ঘটায়। মিথ্যাবাদীর উপর মহান আল্লাহর অভিশাপ। মিথ্যা বলে বা মিথ্যা শপথ করে পণ্য বিক্রি করার পরিণতি খুবই ভয়াবহ। একজন বিক্রেতা তার পন্য বিক্রয় করার সময় অনেকভাবে ক্রেতার সাথে প্রতারণা করতে পারে। পন্যের গুনগত মান গোপন করার মাধ্যমে, ভালো পন্য দেখিয়ে খারাপ পন্য দেওয়ার মাধ্যমে, মিথ্যা শপথের দ্বারা বেশি মূল্য গ্রহণের মাধ্যমে, ওজনে কম দেওয়ার মাধ্যমে। একজন ক্রেতা যেভাবেই হোক বিক্রেতার দ্বারা প্রতারিত হলে মহান আল্লাহর রাসূল () কঠোর ভাষায় তাকে ধিক্কার দিয়েছেন।

عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ (ﷺ) مَرَّ عَلٰى صُبْرَةِ طَعَامٍ فَأَدْخَلَ يَدَهُ فِيْهَا، فَنَالَتْ أَصَابِعُهُ بَلَلًا فَقَالَ : مَا هَذَا يَا صَاحِبَ الطَّعَامِ؟ قَالَ أَصَابَتْهُ السَّمَاءُ يَا رَسُوْلَ اللهِ، قَالَ : أَفَلَا جَعَلْتَهُ فَوْقَ الطَّعَامِ كَيْ يَرَاهُ النَّاسُ، مَنْ غَشَّ فَلَيْسَ مِنِّيْ.

আবূ হুরাইরাহ্ (রা.) হতে বর্ণিত; তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ () একদা কোনো এক খাদ্যস্তুপের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন, তখন তিনি তাঁর হাত ঐ খাদ্যের মাঝে প্রবেশ করান এবং তার হাত ভেজা পেলেন। তখন তিনি () বিক্রেতাকে জিজ্ঞেস করলেন, এটা কী? তখন খাদ্য বিক্রেতা বলে, হে আল্লাহর রাসূল ()! বৃষ্টিতে তা ভিজেছে। আল্লাহর রাসূল () বলেন, কেন তুমি সে খাদ্যগুলোকে উপরে রাখলে না? যাতে ক্রেতা পণ্যের ত্রুটি দেখে নিতে পারে। তিনি () বললেন, যে প্রতারণা করে সে আমার দলভুক্ত নয়।[১১]

আর ‘কসম বা শপথ’ পণ্যদ্রব্যের বিক্রয় বৃদ্ধি করে বটে; কিন্তু লাভ (বরকত) বিনষ্ট করে। রাসূলুল্লাহ ()-এর বাণী :

إِنَّ أَبَا هُرَيْرَةَ (رَضِيَ اللهُ عَنْهُ)، قَالَ : سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ (ﷺ)، يَقُوْلُ : اَلْحَلِفُ مُنَفِّقَةٌ لِلسِّلْعَةِ، مُمْحِقَةٌ لِلْبَرَكَةِ.

আবূ হুরাইরাহ্ (রা.) থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ()-কে বলতে শুনেছি যে, ‘কসম বা শপথ’ পণ্যদ্রব্যের বিক্রয় বৃদ্ধি করে বটে; কিন্তু লাভ (বরকত) বিনষ্ট করে।[১২]


অপর একটি হাদীসে এ দৃষ্টান্ত এভাবে তুলে ধরা হয়েছে,

رَجُل حَلَفَ عَلٰى سِلْعَةٍ بَعْدَ الْعَصْرِ، لَقَدْ أُعْطِيَ بِهَا كَذَا وَكَذَا فَصَدَّقَهُ الْمُشْتَرِيْ وَهُوَ كَاذِبٌ.

“এক ব্যক্তি ‘আসরের পর তার পণ্য সম্পর্কে কসম খেয়ে বলে, তাকে পণ্যটি এত এত মূল্যে দেওয়া হয়েছে। তার কথা ক্রেতা বিশ্বাস করল, অথচ সে মিথ্যুক”।[১৩]


সুতরাং তাঁরা যদি (ক্রয় বিক্রয়ে) সত্য বলে এবং (পণ্য দ্রবের দোষ গুণ) খুলে বলে, তাহলে তাদের ক্রয় বিক্রয়ে বরকত দেয়া হয়। অন্যথা যদি (পণ্যদ্রব্যের দোষগুণ) গোপন করে এবং মিথ্যা বলে তাহলে, বাহ্যত তাঁরা লাভ করলেও তাদের ক্রয় বিক্রয়ের বরকত বিনাশ করে দেয়া হয়। আর মিথ্যা কসম পণ্য দ্রব্য চালু করে ঠিকই, কিন্তু তা উপার্জনে বরকত থাকে না। পরন্ত মিথ্যা বলে বা মিথ্যা কসম খেয়ে ধোঁকা দিয়ে পণ্য বিক্রয় করা অসদুপায়ে অন্যের মাল হরণ করার শামিল। আর আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا لَا تَاْکُلُوْۤا اَمْوَالَکُمْ بَیْنَکُمْ بِالْبَاطِلِ اِلَّاۤ اَنْ تَکُوْنَ تِجَارَۃً عَنْ تَرَاضٍ مِّنْکُمْ ۟ وَلَا تَقْتُلُوْۤا اَنْفُسَکُمْ ؕ اِنَّ اللّٰهَ كَانَ بِکُمْ رَحِیْمًا﴾

“হে মু’মিনগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না; কিন্তু তোমাদের পরস্পরে রাজী হয়ে ব্যবসায় করা বৈধ এবং একে অপরকে হত্যা কর না; নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু।”[১৪]


[১]  সহীহ মুসলিম-হা. ১৭১/১০৬; সুনান আবূ দাঊদ-হা. ৪০৮৭; জামে‘ আত্ তিরমিযী-হা. ১২১১; সুনান আন্ নাসায়ী-হা. ২৫৬৩; সুনান ইবনু মাজাহ্-হা. ২২০৮।

[২] সূরা আল আ‘রাফ : ২৬।

[৩] সহীহুল বুখারী-হা. ৫৭৮৭; সুনান আন্ নাসায়ী-হা. ৫৩৩১।

[৪]  সহীহুল বুখারী-হা. ৫৭৮৮; সহীহ মুসলিম-হা. ২০৮৫; সুনান আবূ দাঊদ-হা. ৪০৯৬; সুনান ইবনু মাজাহ্-হা. ৩৫৭৩।

[৫] সুনান আবূ দাঊদ-হা. ৪০৯৩, আলবানী সহীহ।

[৬] সূরা আত্ তাওবাহ্ : ১২১।

[৭] সূরা আল বাক্বারাহ্ : ২৬২।

[৮] সহীহুল বুখারী-হা. ১০; সহীহ মুসলিম-হা. ৪১।

[৯] মুসনাদে আহমাদ-হা. ১২৫৬১।

[১০] সূরা আল বাক্বারাহ্ : ২৬৪।

[১১] সহীহ মুসলিম-হা. ১০২; সুনান আবূ দাঊদ-হা. ৩৪৫২।

[১২] সহীহুল বুখারী-হা. ২০৮৭; সহীহ মুসলিম-হা. ১৬০৬; সুনান আবূ দাঊদ-হা. ৩৩৩৫।

[১৩] সুনান আবূ দাঊদ-হা. ৩৪৭৪, ৩৪৭৫, সহীহ; সুনান আন্ নাসায়ী-হা. ৪৪৬২, সহীহ।

[১৪] সূরা আন্ নিসা : ২৯।


আপনার মন্তব্য1

ঢাকায় সূর্যোদয় : 5:22:21 সূর্যাস্ত : 6:47:59

সাপ্তাহিক আরাফাতকে অনুসরণ করুন

@সাপ্তাহিক আরাফাত