সাময়িক প্রসঙ্গ
জিজ্ঞাসা ও জবাব
ফাতাওয়া বোর্ড, বাংলাদেশ জমঈয়তে আহলে হাদীস

প্রশ্ন (০১) : অনেকেই বলে থাকেন ‘এখন দিনকাল খারাপ, যামানাই ভাল না’ কিংবা ‘যুগই খারাপ’। এসব কথার ব্যাপারে কোনো সতর্কতার বিষয় রয়েছে কি?
মনসুর আলী
হালিশহর, চিটাগাং।
জবাব : যামানা বা কালকে দোষারোপমূলক যে কোনো কথা বড় পাপের অন্তর্ভুক্ত। যামানা বা কাল তো দোষারোপের পাত্র হওয়া বা গালমন্দ শুনার কোনোকিছু হতে পারে না। যামানা বা কাল কারো খারাপ কাজের জন্য আদৌ দায়ী নয়। যামানাকে গালি দেয়া অবিশ্বাসী কাফিরদের স্বভাব। আল্লাহ তা‘আলা কাফিরদের বদ স্বভাব সম্পর্কে বলেন :
﴿وَقَالُوْا مَا هِيَ إِلَّا حَيَاتُنَا الدُّنْيَا نَمُوْتُ وَنَحْيَا وَمَا يُهْلِكُنَا إِلَّا الدَّهْرُ وَمَا لَهُمْ بِذٰلِكَ مِنْ عِلْمٍ إِنْ هُمْ إِلَّا يَظُنُّوْنَ﴾
“কাফিররা বলে, শুধু দুনিয়ার জীবনই আমাদের জীবন। আমরা এখানেই মরি এবং বাঁচি, যামানাই আমাদেরকে ধ্বংস করে।”[১]
কাফিররা ধ্বংসের জন্য যামানাকে দায়ী করে। তদ্রƒপ অজ্ঞ মুসলিম ব্যক্তিরাও যামানাকে গালি দেয়। মহানাবী (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন,
"يُؤْذِيْنِيْ ابْنُ آدَمَ يَسُبُّ الدَّهْرَ وَأَنَا الدَّهْرُ، بِيَدِيْ الْأَمْرُ أُقَلِّبُ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ".
আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আদম সন্তান আমাকে কষ্ট দেয় সে যামানাকে গালি দেয়; অথচ আমিই হলাম যমানা বা সময়, আমি (যামানার) রাতদিনকে পরিবর্তন ঘটাই।[২]
এখানে আল্লাহ তা‘আলার সাথে যামানার সম্পৃক্তির কথা বলা হয়েছে কারণ মহান আল্লাহই যামানাকে সৃষ্টি করেছেন।[৩]
সুতরাং যুগ বা যামানার দোষের কথা বলা নিষিদ্ধ। যামানা স্বয়ং মন্দের জন্য দায়ী এমনটি ভেবে যামানাকে গালি দেয়া বড় শিরক, আর আল্লাহ সকল কিছুর স্রষ্টা। তবে বিভিন্ন মন্দের চিত্র দেখে যামানাকে দোষারোপ করা হারাম।[৪]
প্রশ্ন (০২) : আমার জানামতে কেউ কেউ মাগরিবের পর সালাতুল আওয়াবীন পড়েন; আবার কেউ বলেন, মাগরিবের পর সালাতুল আওয়াবীন পড়া সঠিক নয়; বরং দিনের প্রথমভাগের সালাত হলো সালাতুল আওয়াবীন। কোন্টি সঠিক?
মোহাম্মদ খোরশেদ আলম
শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার।
জবাব : মাগরিবের সলাতের পর সালাতুল আওয়াবীন পড়ার কোনো ‘আমলযোগ্য দলীল নেই। মাগরিবের সলাতের পর ৬ রাক‘আত ও ২০ রাক‘আত সালাত পড়ার জাল ও নিতান্ত য‘ঈফ কতক হাদীস রয়েছে। যেমন-
“আবূ হুরাইরাহ্ (রাযিয়াল্লা-হু ‘আন্ হু) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন : যে ব্যক্তি মাগরিবের সলাতের পর ৬ রাক‘আত সালাত পড়বে কিন্তু মাঝে কোনো ত্রুটিপূর্ণ কথা বলবে না, তাহলে তার জন্য এটি ১২ বছরের ‘ইবাদতের সমান হবে।” হাদীসখানা জামে‘ আত্ তিরমিযী’তে বর্ণিত হয়েছে।[৫]
ইমাম আত্ তিরমিযী স্বয়ং হাদীসটিকে গরীব বলেছেন এবং রাবী ‘আম্ র ইবনু আবী খাসআমের বর্ণনার শক্ত সমালোচনা করেছেন। ইমাম বুখারী (রাহিমাহুল্লা-হ) উক্ত বর্ণনাকারীকে বলেছেন-
্রعُمَرُ بْنُ عَبْدِ اللهِ بْنِ أَبِيْ خَثْعَمٍ مُنْكَرُ الحَدِيْثِগ্ধ.
‘উমার ইবনু আবী খাসআম মুনকারুল হাদীস (অস্বীকৃত রাবী)।[৬]
অনুরূপভাবে মাগরিবের পর বিশ রাক‘আত সালাত পড়ার দলীলটিও জাল।[৭]
পক্ষান্তরে সালাতুল আওয়াবীন হলো চাশ্তের সালাত বা সালাতুয্ যুহা। তার সঠিক সময়ের কথা হাদীসে বর্ণিত হয়েছে নিম্নরূপে।
যায়েদ ইবনু আরকাম (রাযিয়াল্লা-হু ‘আন্ হু) বলেন,
إِنَّ رَسُوْلَ اللهِ ﷺ، قَالَ : ্রصَلَاةُ الْأَوَّابِيْنَ حِيْنَ تَرْمَضُ الْفِصَالُগ্ধ.
নিশ্চয়ই রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন : সালাতুল আওয়াবীন হলো যখন উটের বাচ্চা রৌদ্রতাপ অনুভব করে।[৮]
সুতরাং স্পষ্টভাবেই প্রমাণিত হলো যে, মাগরিব সলাতের পরে সালাতুল আওয়াবীন বলে কোনো দলীল সম্মত সালাত নেই; বরং বিশুদ্ধ হাদীসে বর্ণিত আওয়াবীনের সালাত হলো দিবসের শুরুতে রৌদ্রের প্রখরতা ছড়ানোর সময় থেকে শুরু করে সূর্য মাথার উপর আসার পূর্ব পর্যন্ত। শাইখ ইবনু উসাইমিন বলেন : সালাতুয্ যুহার ওয়াক্ত হলো সূর্য উঠার পনের মিনিট পর হতে যুহর সালাত শুরু হওয়ার দশ মিনিট পূর্ব পর্যন্ত।[৯]
প্রশ্ন (০৩) : আমি এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করি। রুটিন অনুপাতে আমার ক্লাস নেয়ার ফাঁকে হাতে সময় থাকে। এমতাবস্থায় আমি প্রতিষ্ঠানের বাইরে বা নিজ বাসায় গিয়ে সময় কাটাতে পারব কি-না?
নিশাদ খান
ময়মনসিংহ।
জবাব : আপনার নিয়োগদাতা কর্তৃপক্ষ যদি আপনার জন্য নির্ধারিত সময় দৈনিক প্রতিষ্ঠানের জন্য ধার্য করে থাকেন তবে সেই সময় সম্পূর্ণরূপে আপনাকে প্রতিষ্ঠানে দিতে হবে। প্রতিষ্ঠানে ধার্যকৃত পূর্ণ সময় প্রদান করা আপনার জন্য আমানতস্বরূপ। আপনি বিশেষ প্রয়োজনে কখনো কখনো দায়িত্বশীলগণের অনুমতি সাপেক্ষে প্রতিষ্ঠান থেকে বাহির হতে পারেন। অন্যথায় আপনার উপর অর্পিত আমানতের খিয়ানত করলেন। আমানতের ব্যাপারে তাকিদ দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿إِنَّ اللهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوْا الْأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا﴾
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দেন যে, তোমরা যেনো প্রাপ্য আমানতসমূহ প্রাপকদের নিকট পৌঁছে দাও।”[১০]
আপনার নির্ধারিত দায়িত্বশীলতা সম্পর্কে আপনাকে অবশ্যই জিজ্ঞাসিত হতে হবে। মহানাবী (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন-
্রكُلُّكُمْ رَاعٍ، وَكُلُّكُمْ مَسْئُوْلٌ عَنْ رَعِيَّتِهِগ্ধ.
“তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, তোমাদের দায়িত্বশীলতা সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।”[১১]
উপরোক্ত আয়াত এবং বিশুদ্ধ হাদীস ছাড়াও আমানত যথাযথভাবে আদায় করা এবং দায়িত্ব যথার্থরূপে পালন করার অনেক দলীল বিদ্যমান রয়েছে। সুতরাং কার্যক্ষেত্র থেকে বাইরে যাওয়া বা বিনা অনুমতিতে অনুপস্থিত থাকা পাপের কাজ। চাকুরীজীবীর জন্য নির্ধারিত সময় কর্মক্ষেত্রে থেকে দায়িত্ব পালন করা ওয়াজিব।[১২]
প্রশ্ন (০৪) : আমি আমার স্ত্রীকে ভালোবেসে প্রায় দেড়কোটি টাকার মাল উপহার হিসেবে দিয়েছি। আমার এই উপহারের ব্যাপারে শরী‘আতের কোনো নির্দেশনা আছে কি?
আব্দুল আওয়াল
গাজীপুর।
জবাব : ভালবেসে আপনি আপনার স্ত্রীকে অঢেল সম্পত্তি দিতে পারবেন যদি তা আপনার মোট সম্পত্তির এক তৃতীয়াংশ বা তার কম হয়। এর বেশি হলে তা দেয়া বৈধ নয়।
প্রশ্ন (০৫) : আমি একজন মাদরাসা শিক্ষক। আমাদের মাদরাসায় সকল শিক্ষক চান শিক্ষার্থী তাদেরকে দাঁড়িয়ে সম্মান করুক, তাছাড়া বেআদবী মনে করা হয়। এই বিষয়ে শরী‘আতের বিধান কী?
মোঃ সলিম উদ্দিন
ঢাকা।
জবাব : শিক্ষক বা অন্য কারো সম্মানার্থে দাঁড়ানো ইসলামী শরী‘আর দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ। যে সব শিক্ষক চান ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে যাক সে সকল শিক্ষকগণকে অবিলম্বে এ চিন্তা থেকে ফিরে আসা উচিত এবং তাওবাহ্ করা উচিত। এই বিষয়ে বিশুদ্ধ হাদীসের নির্দেশনা নিম্নরূপ :
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন,
্রمَنْ أَحَبَّ أَنْ يَمْثُلَ لَهُ الرِّجَالُ قِيَامًا فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِগ্ধ.
“যে ব্যক্তি পছন্দ করে লোকেরা তারা জন্য মূর্তিব্য দাঁড়াক, সে যেনো তার বাসস্থান জাহান্নামে করে নিলো।”[১৩]
আনাস (রাযিয়াল্লা-হু ‘আন্ হু) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন :
لَمْ يَكُنْ شَخْصٌ أَحَبَّ إِلَيْهِمْ مِنْ رَسُوْلِ اللهِ ﷺ وَكَانُوْا إِذَا رَأَوْهُ لَمْ يَقُوْمُوْا لِمَا يَعْلَمُوْنَ مِنْ كَرَاهِيَتِهِ لِذٰلِكَ.
সাহাবীগণ রিযওয়ানুল্লাহি ‘আলাইহিমগণের নিকট রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর চেয়ে অধিক প্রিয় কেউ ছিলেন না, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁদের কাছে আগমন করলে তাঁরা দাঁড়াতেন না, কারণ তাঁরা জানতেন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তা পছন্দ করেন না।[১৪]
সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর প্রকৃষ্ট সুন্নাহ হলো- কারো সম্মানার্থে না দাঁড়ানো। আর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সুন্নাহর মধ্যেই রয়েছে সকল কল্যাণ। তাই শিক্ষকগণের জন্য বৈধ নয় তাদের সম্মানার্থে শিক্ষার্থীরা দাঁড়াক এই আদেশ করা এবং এটি পছন্দ করা।[১৫]
প্রশ্ন (০৬) : আমার আর্থিক সঙ্গতি রয়েছে। আমি যদি কোনো ইসলামী বই-পত্র ছাপানোর কাজে কিছু টাকা ব্যয় করি, তবে কি তাতে আমার বিশেষ সওয়াব হবে?
আবুল কালাম
বরিশাল।
জবাব : ইসলামী বই পুস্তক ছাপানোর কাজে আপনার অর্থ ব্যয় নিশ্চয়ই আপনার জন্য সওয়াবের কাজ হবে -ইন্শা-আল্লাহ। আপনার এই কাজের সওয়াবের ধারাবাহিকতা আপনার মৃত্যুর পরও অব্যাহত থাকবে। এই মর্মে মহানাবী (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন-
"إِذَا مَاتَ الْإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثَةٍ : إِلَّا مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ، أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ، أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُوْ لَهُ".
মানুষ যখন মারা যায় তার ‘আমল ছেদ পড়ে যায় তিনটি ‘আমল ব্যতীত : (১) সাদাক্বাহ্ জারিয়া, (২) উপকারী ‘ইল্ম এবং (৩) নেক সন্তান যে তার জন্য দু‘আ করে।[১৬]
সুতরাং ইসলামী বই ছাপানোতে আপনার অর্থ ব্যয় বিরাট সওয়াব লাভের কারণ হবে। এতে আপনার আত্মত্যাগ এবং অংশগ্রহণ যত বেশী হবে ততবেশী আপনি সওয়াবে ভাগীদার হবেন। জীবনব্যাপী এবং মৃত্যুর পরেও এই সওয়াবের অংশীদার আপনি হবেন -ইন্শা-আল্লাহ।
প্রশ্ন (০৭) : ইমামের কিরাআত যদি শুদ্ধ না হয়, সেই ইমামের পিছনে সলাতের ইকতেদা করার ব্যাপারে শরী‘আতের নির্দেশনা কী?
মোঃ মোজাম্মেল হক
রায়গঞ্জ, সিরাজগঞ্জ।
জবাব : ইমামের কিরাআত অশুদ্ধ হয় এমন ইমামকে নিযুক্ত করা উচিত নয়। ইমামের কিরাআত যদি এমন ভুল হয় যাতে আয়াতের অর্থ পরিবর্তন হয়ে যায়, আর যদি তা সূরা আল ফাতিহায় ঘটে তাহলে সে সালাত বাতিল হয়ে যাবে। কারণ সূরা আল ফাতিহাহ্ সলাতের রুকন। শুদ্ধভাবে সূরা আল ফাতিহাহ্ পাঠ করা ওয়াজিব।
ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লা-হ) বলেন, ভুল কিরাআতকারী ব্যক্তির ইমামতি করা মাকরূহ।[১৭]
ইমাম ইবনু কুদামাহ্ (রাহিমাহুল্লা-হ) বলেন : সূরা আল ফাতিহাহ্ ব্যতীত অন্য কিরাআতে ভুল হলে সালাত অশুদ্ধ হবে না।[১৮]
সূরা আল ফাতিহায় অর্থ পরিবর্তনকারী ভুল। যেমন- ্রاَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْগ্ধ -“আপনি তাদেরকে নি‘আমতমণ্ডিত করেছেন” -এর স্থলে পড়ল- ্রاَنْعَمْتُ عَلَيْهِمْগ্ধ -“আমি তাদেরকে নি‘আমতমণ্ডিত করেছি”।
পরিশেষে বলা যায়, কোনো ইমাম যদি সূরা আল ফাতিহার মধ্যে অর্থ পরিবর্তনকারী ভুল করে তবে সালাত বাতিল হবে।
প্রশ্ন (০৮) : আমার মা কিছু দিন আগে মারা গেছেন। মৃত্যুর পূর্বে তিন বছর তিনি অসুস্থতার কারণে সিয়াম রাখতে পারেননি। সে সময় আর্থিক অভাবের কারণে ফিদিয়া দিতে পারিনি। এখন কি আমরা তা দিতে পারব, না-কি অন্য কোনো উপায় আছে?
নাজমুস সাকিব
কারমাইকেল কলেজ।
জবাব : আপনার মাতা তিন বছর রামাযানের সিয়াম পালন করতে পারেননি। এটি যদি তার অব্যাহত অসুস্থতার কারণে হয়ে থাকে যাতে তিনি সিয়ামগুলো কাযা করার মতো সুস্থ হননি, তাহলে আপনার সিয়ামগুলোর জন্য ফিদিয়া আদায় করে দিবেন।[১৯]
আর যদি আপনার মাতা সিয়াম কাযা করার মতো সুস্থতা লাভ করে থাকেন আর তা করেনি সেই অবস্থায় আপনাদেরকে তা করে নিতে হবে। এই মর্মে দলীল হলো-
أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ ﷺ، قَالَ : ্রمَنْ مَاتَ وَعَلَيْهِ صِيَامٌ صَامَ عَنْهُ وَلِيُّهُগ্ধ.
“যে ব্যক্তি মারা গেল এবং তার উপর সিয়াম অপরিহার্য ছিল তাতে তার ওয়ালী-ওয়ারিসগণ সিয়াম রেখে নিবে।”[২০]
রোগী ব্যক্তি সুস্থ হয়ে কাযা সিয়াম পালন না করলে ওয়ালী ওয়ারিসগণ তা পালন করবে।[২১]
আপনার মায়ের রোগ তিন বছরব্যাপী অব্যাহত থেকে তিনি মারা গেলে কারো মতে ফিদিয়া দিতে হবে তবে অধিকাংশের মতে কাযা পালন বা ফিদিয়া কিছুই করতে হবে না।[২২]
প্রশ্ন (০৯) : মাসজিদ তো মহান আল্লাহর ঘর, সকল মুসলিমই সেখানে সালাত আদায় করতে যায়। কিন্তু মাসজিদগুলো সালাফী, আহলে হাদীস বা হানাফী নামকরণ করে নাম দেয়া হয় কেন?
মোহাম্মাদ হেলাল
কর্ণফুলী, চট্টগ্রাম।
জবাব : বিশেষ ব্যক্তি বা দল, ‘আলেম, নেক ব্যক্তি, গোত্র বা বংশ বা স্থান ইত্যাদী নামে মাসজিদের নামকরণ করা জায়িয। তাই মাসজিদের নামে সালাফী, আহলে হাদীস ইত্যাদি নামকরণ কোনোরূপ দোষণীয় নয়।
মহানাবী (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সাথে সম্বন্ধিত করে মাদীনার মাসজিদের ‘মাসজিদে নববী’, কুবা পল্লীর সাথে সম্পৃক্ত করে ‘মাসজিদে কুবা’, বিলাল (রাযিয়াল্লা-হু ‘আন্ হু)’র সাথে সম্বন্ধিত করে ‘মাসজিদে বিলাল’, ‘মাসজিদে বানী যুরায়ক’ নামকরণ এ সবই এ বিষয়ের প্রামাণ্য দলীল।
বস্তুতঃ এই নামকরণ বিশেষ পরিচিতি বহন করে বটে, নচেৎ মাসজিদ নিঃসন্দেহে মহান আল্লাহর ঘর যুরাইক গোত্রের নামে মাসজিদের নামকরণের দলীল সহীহুল বুখারীতে বিদ্যমান রয়েছে।[২৩]
বিশ্বখ্যাত ফাতাওয়া সম্ভার ফাতাওয়া আল লাজনাহতে বলা হয়েছে, কোনো বংশ, জামা‘আত বা গোত্রের নামে মাসজিদের নামকরণ বৈধ রয়েছে। যেমন- মাসজিদে কুবা এবং মাসজিদে বানী যুরাইকের নাম। এর বর্ণনা সহীহুল বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে।[২৪]
সুতরাং সালাফী বা আহলে হাদীস মাসজিদ নামকরণে সন্নিবেশিত করা বৈধ রয়েছে। তাছাড়া এই নামকরণের পেছনে অন্যবিধ কারণও নিহিত থাকে। যেমনটি আহলে হাদীসগণের আবাদকৃত মাসজিদ অন্যরা যেনো দখল করে নিতে না পারে; অনেক স্থানে যেটির হুমকী দেখা দেয়। ফলে বাধ্য হয়ে মাসজিদের দলীলে ও নামকরণে আহলে হাদীস নামকরণ করা হয়। যে উদ্দেশ্যেই হোক এমন সুন্দর বৈশিষ্টমণ্ডিত নামে নামকরণ করা মাসজিদের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ জায়িয রয়েছে।
প্রশ্ন (১০) : একটা মেয়ের সাথে আমার প্রেমের সম্পর্ক হয়। আমি তাকে বিয়ে করব বলে শপথ করেছি। আমার বাবা-মা আরও ভাল মেয়ে আমাকে বিয়ে করাতে চাচ্ছেন। আমার মনে হচ্ছে আমি যাকে কথা দিয়েছিলাম তাকে বিয়ে না করা অনেক বড় ধোঁকা। এমতাবস্থায় আমি কী করতে পারি?
আব্দুস সোবহান
উত্তরা, ঢাকা।
জবাব : আপনি প্রথমোক্ত যে মেয়েটির সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়েছেন তা নিতান্ত গর্হিত কাজ করেছেন। ইসলামে এ ধরনের গোপন প্রণয় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তদুপরি আপনি সেই মেয়েটিকে বিয়ে করার শপথ করেছেন বা কসম করেছেন -এ কাজও আপনার অন্যায় হয়েছে। আপনি বলছেন আপনার বাবা ও মা আরও ভাল মেয়ের সাথে আপনাকে বিয়ে দিতে চাচ্ছেন। সর্বোতভাবে আপনার বাবা-মার কথা মেনে নেয়া এবং ভাল পাত্রী গ্রহণ করাই আপনার জন্য কল্যাণকর হবে যদি আপনি বিবেক দিয়ে অনুভব করার ক্ষমতা রাখেন। অন্যদিকে আপনি যার সাথে সম্পর্ক করে বিয়ে করার কসম করেছিলেন, আপনার উচিত সেই কসম থেকে ফিরে আসা এবং কাফ্ফারা দিয়ে দেয়া। এর কাফ্ফারা হলো দশজন মিসকীন খাওয়ানো বা ১০জন মিসকীনকে কাপড় দেয়া। মহানাবী (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন-
্রإِذَا حَلَفْتَ عَلٰى يَمِيْنٍ، فَرَأَيْتَ غَيْرَهَا خَيْرًا مِنْهَا، فَكَفِّرْ عَنْ يَمِيْنِكَ وَأْتِ الَّذِيْ هُوَ خَيْرٌগ্ধ.
“যখন তুমি কোনো শপথ করবে, এর বাইরে অন্য কিছু এর চেয়ে উত্তম দেখো তাহলে তোমার শপথ ভঙ্গের কাফ্ফারা দিয়ে দাও এবং উত্তম কাজটি করে নাও।”[২৫]
সুতরাং আপনার জন্য করণীয় কাজ হবে গোপন প্রণয় সম্পর্ক জনিত কারণে তাওবাহ্ ও অনুশোচনা করে ফিরে আসা এবং শপথের কাফ্ফারা দিয়ে বাবা-মার কথা মেনে নিয়ে অধিকতর ভাল মেয়েকে বিয়ে করে নেয়া।
প্রশ্ন (১১) : ইসলাম তো ন্যায় এবং সাম্য ও ঐক্যের ধর্ম। আমরা দেখি প্রতিটি মুসলিম সমাজে বংশ ও গোষ্ঠীর বিভাজন মারাত্মক। ন্যায়-অন্যায় না দেখেই অনেকেই গোষ্ঠীকেই সমর্থন করে। শরী‘আর দৃষ্টিতে এর সমাধান কী?
ওয়াহিদুল্লাহ
রাজশাহী।
জবাব : ইসলামে গোষ্ঠী, সম্প্রদায়, জাতীয়তাবাদ এবং আঞ্চলিকতার কোনো অস্তিত্ব নেই। এসব বিভাজন জাহেলিয়াতের উপাদান। এ ধরনের বিভাজনকে সর্বোতভাবে ঘৃণা করতে হবে এবং পরিহার করতে হবে। মহানাবী (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সময়ে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আনসার ও মোহাজিরগণের মধ্যে একবার সংঘাত লাগার উপক্রম হলো এবং প্রত্যেকেই যার যার সম্প্রদায়কে ডাকতে লাগলে মহানাবী (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন,
্রدَعُوْهَا فَإِنَّهَا مُنْتِنَةٌগ্ধ وَفِىْ روايَةٍ ্রفَلَا بَأْسَ وَلْيَنْصُرِ الرَّجُلُ أَخَاهُ ظَالِمًا أَوْ مَظْلُوْمًا، إِنْ كَانَ ظَالِمًا فَلْيَنْهَهُ، فَإِنَّهُ لَهُ نَصْرٌ وَإِنْ كَانَ مَظْلُوْمًا فَلْيَنْصُرْهُগ্ধ.
তোমরা এমনটি ছাড়ো, এটি একটি দুর্গন্ধযুক্ত কথা। অন্য বর্ণনায় রয়েছে- এমন কি হয়েছে? মনে রাখবে, প্রত্যেক ব্যক্তি যেনো তার অন্য মুসলিম ভাইকে সাহায্য করে চাই সে যালিম বা মাযলুম হোক। যালিম হলে তাকে যুল্ম থেকে থামাবে, এটি হবে তার সাহায্য আর মাযলুম হলে তাকে সাহায্য করবে।[২৬]
বিশ্বনাবী নাবী (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর উপরিউক্ত মহাবাণীতে সুস্পষ্ট হয়েছে ইসলামে সংকীর্ণ গোষ্ঠী চিন্তা, আঞ্চলিকতাবাদ, জাতীয়তাবাদ এবং সাম্প্রদায়িকতার কোনো স্থান নেই; বরং এ ধরণের আহ্বান কদর্য এবং নোংরা জাহিলিয়াতের কর্মকাণ্ড।
তাই প্রতিটি মুসলিম সংকীর্ণ চিন্তা-চেতনা বাদ দিয়ে মুসলিম ভ্রাতৃত্ব এবং বিশ্বব্যাপী মুসলিম ঐক্যকে প্রাধান্য দিবে। সত্য এবং ন্যায়ের জন্য তারা উদারভাবে কাজ করবে।
প্রশ্ন (১২) : আমাদের গ্রামের মাসজিদের ইমামের বিতর্কিত স্বভাব ও আচরণের জন্য অধিকাংশ মুসল্লী তাকে পছন্দ করছে না। ইমাম সাহেব কতিপয় প্রভাবশালীকে হাত করে ইমামতি করে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় এ ধরনের ইমামের ব্যাপারে ইসলামের বিধান কি?
রবীউল ইসলাম
বগুড়া।
জবাব : যে ইমামের প্রতি তার স্বভাব চরিত্র কিংবা অন্যবিধ ভুল-ভ্রান্তির জন্য মুসল্লীগণ অসন্তুষ্ট সে ইমামের উচিত নয় ইমামতিতে থেকে যাওয়া। এ ধরনের ইমাম মাসজিদের ইমামতি করেও গুনাহগার হবে। মহানাবী (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন,
"ثَلَاثَةٌ لَا تُجَاوِزُ صَلَاتُهُمْ آذَانَهُمْ : الْعَبْدُ الْآبِقُ حَتّٰى يَرْجِعَ وَامْرَأَةٌ بَاتَتْ وَزَوْجُهَا عَلَيْهَا سَاخِطٌ وَإِمَامُ قَوْمٍ وَهُمْ لَهُ كَارِهُوْنَ".
তিন ব্যক্তির সালাত তাদের কানের উপরে পার হয় না তথা কবুল হয় না। মালিকের কাছ থেকে পালিয়ে যাওয়া গোলাম, যতক্ষণ না সে মালিকের নিকট ফিরে আসে। সে মহিলার সালাত যে রাত কাটায়; অথচ তার স্বামী তার উপর অসন্তুষ্ট। সে ইমামের সালাত যে সালাত পড়ায়, অথচ মুসল্লীরা তার সালাত পড়ানোটা পছন্দ করছে না।[২৭]
উপরিউক্ত হাদীস স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে, প্রত্যেক ইমামের উচিত প্রভাবশালীদের হাত করা বাদ দিয়ে নিজেদের পরিশুদ্ধ করা অন্যথায় ইমামের পদ থেকে সরে যাওয়া। আল্লাহ তা‘আলা ভাল জানেন।


[১] সূরা আল জা-সিয়াহ্ ৪৫ : ২৪।
[২] সহীহুল বুখারী- হাঃ ৪৮২৬, সহীহ মুসলিম- হাঃ ২২৪৬।
[৩] ফাতাওয়া আল ‘আক্বীদাহ্- আশ্ শাইখ উসাইমিন, ১/১৬।
[৪] ফাতাওয়া আল ‘আক্বীদাহ্- ১/১৯৭।
[৫] সুনান আত্ তিরমিযী- হাঃ ৪৩৬।
[৬] য‘ঈফুল জামে‘- হাঃ ৫৬৬১, য‘ঈফ তিরমিযী- পৃঃ ৪৮-৪৯।
[৭] তাহ্ক্বীক্ব মিশকাত- হাঃ ১১৭৪।
[৮] সহীহ মুসলিম- হাঃ ১৭৮০, মাঃ শাঃ, হাঃ ১৪৩/৭৪৮।
[৯] আশ্ শারহুল মুমতি- ৪/১২২।
[১০] সূরা আন্ নিসা ৪ : ৫৮।
[১১] সহীহুল বুখারী- হাঃ ৮৯৩।
[১২] ফাতাওয়া উলামায়ি বালাদিল হারাম- পৃঃ ১২৫৪।
[১৩] আবূ দাঊদ- হাঃ ৫২২৯, সহীহ, আহমাদ- হাঃ ১৬৮৩০।
[১৪] সুনান আত্ তিরমিযী- হাসান সহীহ, মিশকাত- হাঃ ৪৬৯৮।
[১৫] মাজাল্লাতুল বুহূছিল ইসলামিয়া- ২৬/৩৪৭।
[১৬] সহীহ মুসলিম- হাঃ ১৬৩১।
[১৭] রওজাতুত তালিবীন- ১/৩৫০।
[১৮] মুগনী- ২৯/৩-২৩।
[১৯] এটি তাউস ও ক্বাতাদাহ্ (রাযিঃ)’র মত- শারহিল মুহা।
[২০] সহীহুল বুখারী- হাঃ ১৯৫২, সহীহ মুসলিম- হাঃ ১১৪৭।
[২১] আওনুল মা‘বূদ- ৭/২৬।
[২২] মুগনী- ৩/২৪১।
[২৩] সহীহুল বুখারী- হাঃ ৪২০।
[২৪] ফাতাওয়া আল লাজনাহ আদ্ দায়িমা- ৫/২৮০-২৮৪ পৃঃ।
[২৫] সহীহুল বুখারী- হাঃ ৬৬২২।
[২৬] সহীহুল বুখারী- হাঃ ৪৯০৫, সহীহ মুসলিম- ৬২/২৫৮৪।
[২৭] আত্ তিরমিযী- হাঃ ৩৬০, সহীহুল জামি‘- হাঃ ৩০৫৭।


আপনার মন্তব্য1

ঢাকায় সূর্যোদয় : 5:22:21 সূর্যাস্ত : 6:47:59

সাপ্তাহিক আরাফাতকে অনুসরণ করুন

@সাপ্তাহিক আরাফাত