সাময়িক প্রসঙ্গ
গণতন্ত্র, নির্বাচন এবং আমাদের সংকট
অধ্যাপক মুহাম্মদ আসাদুল ইসলাম

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি-২০২৬ বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার এ নির্বাচন মূলত দু’পক্ষের ভোটের লড়াই হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’র নেতৃত্বে একটি জোট এবং ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী’র নেতৃত্বে অপর একটি জোটই এ লড়াইয়ের প্রধান প্রতিপক্ষ। ২০২৪-র ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের ফলে উৎখাত হওয়া এবং পরবর্তীতে নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগ এবং তাদের প্রকাশ্য সঙ্গীরা এ ময়দানে অনুপস্থিত। নিষিদ্ধ না হলেও সাবেক প্রেসিডেন্ট এরশাদের ‘জাতীয় পার্টি’ বেশ দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। চরমোনাইয়ের পীরের দল ‘ইসলামী আন্দোলন’ শুরুতে জামা’আতের জোটে থাকলেও পরবর্তীতে বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে। ‘জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম’ শুরু থেকেই বিএনপি জোটে যোগ দিয়েছে। তবে সবচে’ উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের ফসল ‘ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি’ (জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি) জামা’আতের ১০ দলীয় জোটের সক্রিয় অংশীদার। এর বাইরেও কিছু দল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য মতে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৮টি আসনের জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে ১৭৩২ জন এবং ২৪৯ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী এ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লক্ষ ভোটার এবার ভোট প্রদানের সুযোগ পাবেন। এই প্রথম প্রবাসীরাও পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে এই নির্বাচনের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে সংবিধানে চব্বিশের বিপ্লবের ইশতেহার বহু কাঙ্ক্ষিত ‘জুলাই সনদ’ সংযোজনের পক্ষে সাংবিধানিক গণভোট (হ্যাঁ/না ভোট) যা যুগপৎ অনুষ্ঠিত হবে। সরকারী-বেসরকারী বিভিন্ন পর্যায়ে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ইতোমধ্যে ব্যাপক প্রচারণাও শুরু হয়েছে। ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হলে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার মধ্যে একটি যৌক্তিক ভারসাম্য তৈরি করা হবে। কোনো ব্যক্তি ১০ বছরের বেশি (বা দুই মেয়াদের বেশি) প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না —এমন নিয়ম স্থায়ী করা হবে। জাতীয় সংসদে একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে, যা সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে একক দলের আধিপত্য রোধ করবে এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে বিশেষজ্ঞ মতামত নিশ্চিত করবে। বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও শক্তিশালী হবে, যাতে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার পেতে পারে। নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থা বা এ জাতীয় কোনো স্থায়ী কাঠামো গঠনের বিধান আসবে, যাতে ভবিষ্যতে নির্বাচনের আগে অনিশ্চয়তা তৈরি না হয়। ইন্টারনেট সেবা কখনোই বন্ধ করা যাবে না —এমন অধিকারসহ নাগরিক অধিকারের তালিকা আরও দীর্ঘ ও শক্তিশালী করার সুযোগ আসবে। নির্বাচন কমিশন (ঊঈ) এবং সরকারি কর্ম কমিশন (চঝঈ) গঠনে সরকারি ও বিরোধী দলের যৌথ অংশগ্রহণের মাধ্যমে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা যাবে।

১৭ বছরের আওয়ামী শাসনের পর আসন্ন এই নির্বাচন এক দিকে ব্যাপক আগ্রহের জন্ম দিয়েছে; অপরদিকে, মুসলিমপ্রধান এই দেশে শাসক নির্বাচনের এ গণসংঘাতমূলক এবং হিংসাত্মক এই নির্বাচন পদ্ধতি আমাদের জাতীয় অনৈক্যের বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যক্তিকেন্দ্রিক দানবীয় লিপ্সা আর দলীয় ফ্যাসিজমের যাঁতাকলে পিষ্ট আজ গোটা দেশ। কারণ চাঁদাবাজি, ঘুষ, খুন, ধর্ষণ, মানব পাচার, অর্থ পাচার, রাহাজানি, পরনিন্দা, মিথ্যা অপবাদ —এ সব অপকর্ম আগে শুধু ব্যক্তি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন তো এগুলো রাজনৈতিক শেল্টারে সম্পন্ন হয়। ভোট ব্যাংক রক্ষা করতে গিয়ে অপরাধীদের অপরাধ আমলে নেয়া হয় না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোও এ ক্ষেত্রে পদক্ষেপ নিতে পারে না। এ অবস্থার আশু সমাধান সেকিউলার এবং ‘আমজনতার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সম্ভব নয়। আর এ কারণে অনেকেই গণতন্ত্রের সমালোচনা করছেন। তবে শুধু স্বপ্ন আর সমালোচনায় সীমাবদ্ধ থাকলে সমাধান আসবে না। সুনির্দিষ্ট ক্রাইটেরিয়ার ভিত্তিতে সৎ, যোগ্য এবং পরহেজগার ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গ্রাম থেকে পর্যায়ক্রমে সংসদ পর্যন্ত কাউন্সিল গঠন করে অগ্রসর হলে একটি বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে ওঠতে পারে, যা ক্রমশ খিলাফত ব্যবস্থায় রূপ নিতে পারে। আলেম সমাজ সক্রিয় উদ্যোগ নিলে সাফল্য আসবে ইন শা-আল্লাহ।



weeklyarafat


আপনার মন্তব্য1

ঢাকায় সূর্যোদয় : 6:36:45 সূর্যাস্ত : 5:49:11

সাপ্তাহিক আরাফাতকে অনুসরণ করুন

@সাপ্তাহিক আরাফাত