আল্লাহ তা‘আলার অমিয় বাণী
﴿يَاأَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا كُوْنُوْا قَوَّامِيْنَ بِالْقِسْطِشُهَدَآءَ لِلّٰهِ وَلَوْ عَلٰى أَنْفُسِكُمْ أَوِ الْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِيْنَإِنْ يَكُنْ غَنِيًّا أَوْ فَقِيْرًا فَاللهُ أَوْلَى بِهِمَا فَلَا تَتَّبِعُوْا الْهَوَىأَنْ تَعْدِلُوْا وَإِنْ تَلْوُوْا أَوْ تُعْرِضُوْا فَإِنَّ اللهَ كَانَ بِمَا تَعْمَلُوْنَخَبِيْرًا﴾
সরল বাংলায় আনুবাদ
“হে মু’মিনগণ! তোমরা ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকো আল্লাহর জন্য সাক্ষ্যদাতা হিসাবে, যদিও সেটি তোমাদের নিজেদের কিংবা তোমাদের পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের বিরুদ্ধে যায়। (বাদী-বিবাদী) ধনী না গরীব (সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করো না)। কেননা তোমাদের চাইতে আল্লাহ তাদের অধিক শুভাকাংখী। অতএব ন্যায়বিচারে প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না। আর যদি তোমরা ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা বল অথবা পাশ কাটিয়ে যাও, তবে জেনে রেখ আল্লাহ তোমাদের সকল কর্ম সম্পর্কে অবহিত।”[১]
সূরা ও আয়াতের পরিচয় ও আলোচ্য বিষয়
দরসে উল্লেখিত আয়াতটি কুরআনুল কারীমের চতুর্থ সূরা, সূরা আন্-নিসা’র ১৩৫ নং আয়াত। এই সূরায় মোট ১৭৬টি আয়াত এবং ২৪টি রুকূ‘ রয়েছে। সূরাটি মদিনায় অবতীর্ণ হয়েছে বলে তাকে মাদানী সূরা বলা হয়।
এই সূরাটির আলোচ্য বিষয় হলো দু‘টি। এক-নারী, এতিম, উত্তরাধিকার, বিবাহ ও পারিবারিক অধিকার সংক্রান্ত সাধারণ আলোচনা। দুই- বৃহৎ পরিবার, মদিনার বিভিন্ন সম্প্রদায়। যেমন- মুনাফিক্ব এবং তাদের সঙ্গীদের বিভিন্ন আলোচনা। এই আলোচ্য বিষয় থেকে এ বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, এই সূরাতে মুসলিমদের জীবনপরিচালনা ও কীভাবে একতাবদ্ধ থাকতে হবে সে সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে।
আয়াতের সংক্ষিপ্ত তাফসীর
অত্র আয়াতে মুসলিম উম্মাহকে সর্বদা ইনসাফ ও ন্যায়নিষ্ঠার উপরে অটল থাকতে এবং সত্য সাক্ষ্য দান করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দুনিয়াতে নবী-রাসূল প্রেরণ ও ঐশী কিতাবসমূহ নাযিলের মূল উদ্দেশ্যই হলো মানব সমাজকে ইনসাফ ও ন্যায়নিষ্ঠার উপরে প্রতিষ্ঠিত রাখা। যেমন- আল্লাহ সুব্হা-নাহু তা‘আলা বলেন,
﴿لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنَاتِ وَأَنْزَلْنَا مَعَهُمُالْكِتَابَ وَالْمِيْزَانَ لِيَقُومَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ﴾
“নিশ্চয়ই আমি আমার রাসূলগণকে সুস্পষ্ট প্রমাণাদিসহ প্রেরণ করেছি এবং তাদের সঙ্গে প্রেরণ করেছি কিতাব ও ন্যায়দণ্ড। যাতে মানুষ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে।”[২]
এখানে ন্যায়নীতির গুরুত্ব বুঝানোর জন্য ‘মীযান’ শব্দটিকে পৃথকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। না হয় একমাত্র এমন কিতাবই নাযিল করা হয়েছে, যার মধ্যেই ন্যায়নীতি বর্ণিত হয়েছে। এর দ্বারা এটাও বুঝানো হয়েছে যে, আল্লাহর কিতাবভিত্তিক ন্যায়নীতিই হলো প্রকৃত ন্যায়নীতি এবং তা প্রতিষ্ঠা করাই হলো মু’মিনের প্রধান কর্তব্য। মানুষের মনগড়া আইন প্রকৃত ন্যায়নীতির মানদণ্ড নয়। আয়াতে ‘ধনী ও গরীবের’ কথা উল্লেখ করা হয়েছে এজন্য যাতে এর দ্বারা ন্যায়বিচার প্রভাবিত না হয়। অতঃপর ‘ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা বলা এবং পাশ কাটিয়ে যাওয়ার কথা এজন্য বলা হয়েছে যে, ক্ষমতাশালীরা সর্বদা নিজেদের সংগঠনপ্রীতি, দলপ্রীতি ও স্বজনপ্রীতির ফলে কৃত বে-ইনসাফীর কথা কৌশলে এড়িয়ে যেতে চায়। কিন্তু আল্লাহর চোখকে ফাঁকিদেওয়ার উপায় নেই। আল্লাহ পরিষ্কারভাবে তাঁর বান্দাকে হুঁশিয়ার করে সেকথা জানিয়ে দিয়েছেন।
ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠায় প্রতিবন্ধকতাসমূহ- ইনসাফ ও ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠার প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসাবে আল্লাহ দু’টি বিষয় উল্লেখ করেছেন। এক- আত্মীয়-স্বজন এবং দুই- দল-সংগঠন। আত্মীয়তার বিষয়টি সূরা আন্-নিসা’র আলোচ্য আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। অতঃপর দল ও সংগঠনের বিষয়টি উল্লেখ করে আল্লাহ বলেন,
﴿يَاأَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا كُوْنُوْا قَوَّامِيْنَ لِلّٰهِ شُهَدَآءَبِالْقِسْطِ وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلٰى أَلَّا تَعْدِلُوْا اعْدِلُوْاهُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَى وَاتَّقُوْا اللهَ إِنَّ اللهَ خَبِيْرٌ بِمَا تَعْمَلُوْنَ﴾
“হেঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে সত্য সাক্ষ্য দানে অবিচল থাকো এবং কোনো সম্প্রদায়েরপ্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে সুবিচার বর্জনে প্ররোচিত না করে। তোমরা ন্যায়বিচার করো,যা আল্লাহভীতির অধিকতর নিকটবর্তী। তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরসকল কৃতকর্ম সম্পর্কে সম্যক অবগত।”[৩]
লক্ষণীয় যে, সূরা আন্-নিসা’য় اَلْقِسْطُ বা ইনসাফকে আগে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে এই ধারণার অপনোদন করা হয়েছে যে, আত্মীয়তা রক্ষাও তো আল্লাহর জন্যই হয়ে থাকে। তার প্রতিবাদে الْقِسْطُ বা ইনসাফকে আগে এনে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, ন্যায়বিচারের বিপক্ষে আত্মীয়তার প্রতি লক্ষ্য রাখা কখনোই আল্লাহর জন্য হতে পারে না। অন্যদিকে সূরা আল-মায়িদাহ্’য় শত্রুপক্ষের সাথে ন্যায় বিচারের নির্দেশ দিতে গিয়ে لِلّٰهِ অর্থাৎ- ‘আল্লাহর জন্য’ কথাটি আগে আনা হয়েছে। এর দ্বারা শত্রুর প্রতি বিদ্বেষ থাকার স্বভাবগত ভাবাবেগ থেকে সংযত থাকতে বলা হয়েছে এবং বলে দেওয়া হয়েছে যে, তোমরা আল্লাহর জন্য দণ্ডায়মান হয়েছ। অতএব আল্লাহকে ভয় করো এবং শত্রুপক্ষের সাথে ন্যায়বিচার করো। মোটকথা আলোচ্য সূরা আন্-নিসা ও একই মর্মে সূরা আল-মায়িদাহ্’য় বর্ণিত আয়াত দু’টির মর্মকথা হলো- (১) আত্মীয়-অনাত্মীয় বা শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে সবার প্রতি ন্যায়নীতি ও সুবিচারে অটল থাকা এবং (২) আল্লাহর জন্য সত্য সাক্ষ্য দেওয়া, যাতে সুবিচার সম্ভব হয়।
উপরেবর্ণিত দু’টি প্রতিবন্ধকতা অর্থাৎ- আত্মীয়তা ও দলীয়তা হতে মুক্ত হওয়া কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। মানুষ সমাজবদ্ধ জীব। তারা পরস্পরে যেমন আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ, তেমনি আত্মরক্ষারতাকীদে কিংবা নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য হাসিলে দল গঠন করাও তার স্বভাবজাত। এ দু’টির ভালোদিককে ইসলাম সর্বদা উৎসাহিত করেছে। কিন্তু খারাপ দিককে নিন্দা করেছে। যেমন- বাপ-দাদারদোহাই পেড়ে ইসলাম কবুল না করা[৪] ও দলের দোহাই দিয়ে সত্যকে চিনেও তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া[৫]। ইহূদী-নাসারারা ইসলামের সত্য বুঝেও তা কবুল করেনি। অন্যদিকে আল্লাহ তা‘আলা আত্মীয়তার বন্ধনকে সর্বদা মযবূত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন যতক্ষণ না তা আল্লাহ প্রদত্ত সীমালংঘন করে[৬]। একইভাবে তিনি দলীয় পরিচয় অক্ষুন্ন রাখার অনুমোদন দিয়েছেন যতক্ষণ তা মহান আল্লাহর উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়। যেমন- আনসার ও মুহাজির নামের দলীয় পরিচয় আল্লাহ তা‘আলা স্বয়ং কুরআনেই উল্লেখ করে তাদের প্রশংসা করেছেন[৭]। আত্মীয়তা রক্ষা করা ও দলীয়তা বজায় রাখা তখনই নিষিদ্ধ হবে, যখন তা স্রেফ দুনিয়াবী কোনোহীন স্বার্থে হবে এবং তার লক্ষ্য ‘হাবলুল্লাহ’কে বাদ দিয়ে ‘হাবলুশ শয়তান’-কে আঁকড়ে ধরাহবে। এদিকে ইঙ্গিত করেই আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ দিয়েছেন,
﴿وَاعْتَصِمُوْا بِحَبْلِ اللهِ جَمِيْعًا وَلَاتَفَرَّقُوْا﴾
“তোমরা সকলে সমবেতভাবে আল্লাহর রজ্জুকে ধারণ করো এবং পরস্পরে বিচ্ছিন্ন হয়ো না।”[৮]
পরের আয়াতে ব্যাখ্যা দিয়ে বলা হয়েছে,
﴿وَلَا تَكُوْنُوْا كَالَّذِيْنَ تَفَرَّقُوْا وَاخْتَلَفُوْا مِنْبَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْبَيِّنَاتُ وَأُوْلَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ عَظِيْمٌ﴾
“তোমরাতাদের মতো হয়ো না, যারা পরস্পরে বিচ্ছিন্ন হয়েছে এবং স্পষ্ট প্রমাণাদি এসে যাওয়ার পরেও তাতে মতভেদ করেছে। এদের জন্য রয়েছে ভয়ংকর শাস্তি।”[৯]
তার পূর্বে আল্লাহ তা‘আলা বলে দিয়েছেন,
﴿يَاأَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا اتَّقُوْا اللهَحَقَّ تُقَاتِهِ﴾
“হে মু’মিনগণ! তোমরা যথার্থভাবে আল্লাহকে ভয় করো।”[১০]
উপরোক্ত তিনটি আয়াতে পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, জাতীয় ও সমষ্টিগত উন্নতি নির্ভর করছে দু’টি বিষয়ের উপরে- (১) আল্লাহভীতি, (২) সমবেতভাবে মহান আল্লাহর রজ্জুকে ধারণ করা। প্রথমটি না থাকলে মানুষ দুর্নীতিবাজ হবে এবং দ্বিতীয়টি না থাকলে সামাজিক ঐক্য ওন্যায়নীতি বিনষ্ট হবে। অত্র আয়াতে এ বিষয়ে স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে যে, যখনই কোনো দল বা সংগঠন “হাবলুল্লাহ”কে বাদ দিয়ে স্রেফ ব্যক্তি পূজা ও অনৈসলামী আদর্শ পূজায় লিপ্ত হবে, সেই দল বা সংগঠন থেকে ঈমানদার ব্যক্তিকে বেরিয়ে আসতে হবে। জাহেলী যুগে আরবদের মধ্যে উক্ত দু’টিদোষ অর্থাৎ- দলপ্রীতি ও স্বজনপ্রীতি বর্তমান ছিল। যা উপরোক্ত দু’টি প্রতিষেধক অর্থাৎ-তাক্বওয়া ও হাবলুল্লাহ প্রয়োগের মাধ্যমে দূরীভূত হয় এবং সেই পতিত সমাজের লোকগুলোদুনিয়ার সেরা মানুষে পরিণত হয়। বাংলাদেশের বর্তমান পতিত সমাজকে উন্নত করতে গেলে ঐএকই প্রতিষেধক প্রয়োগ করতে হবে, অন্য কিছুই নয়।
বস্তুতঃ আদি পিতা আদম (সা.) হতে শেষ নবী মুহাম্মাদ (সা.) পর্যন্ত লক্ষাধিক নবী-রাসূল এবং শতাধিক সহীফা ও আসমানী কিতাব নাযিল করার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল মানব সমাজে ইনসাফ ও শান্তি-শৃংখলা প্রতিষ্ঠা করা। নৈতিক উপদেশ ও উপযুক্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানুষকে ন্যায় ও ইনসাফের পথে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। যারা অবাধ্যতা করেছে, তাদেরকে প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে ন্যায়ের পথে ফিরে আসতে বাধ্য করার কথা বলা হয়েছে। আলোচ্য আয়াতে সরকার ও জনগণ সবাইকে ন্যায় ও ইনসাফের উপরে দৃঢ় থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সত্যসাক্ষ্য ও বাস্তবতা : আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,
“তোমরা আল্লাহর জন্য সত্য সাক্ষ্য দানে অবিচল থাকো।”
সাক্ষ্যের অপরদিক হলো- সুপারিশ করা। সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে সাক্ষ্য ও সুপারিশ থাকলে তার পরকালীন সওয়াব অত্যধিক। আর বিপরীত হলে তার মন্দ পরিণতিও ভয়ংকর। যেমন- আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿مَنْ يَّشْفَعْ شَفَاعَةً حَسَنَةً يَكُنْ لَهُ نَصِيْبٌ مِنْهَا وَمَنْيَّشْفَعْ شَفَاعَةً سَيِّئَةً يَكُنْ لَهُ كِفْلٌ مِنْهَا﴾
“যে ব্যক্তি ভালো কাজে সুপারিশ করে, সে তার নেকী পায় এবং যে ব্যক্তি মন্দ কাজে সুপারিশ করে সে তার অংশ পায়।”[১১]
আদালতে সাক্ষ্য প্রদান, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় নম্বর প্রদান, আইনজীবীদের বাদী ও বিবাদী পক্ষ সমর্থন, নেতৃত্ব নির্বাচন সবই উক্ত আয়াতের আওতাভুক্ত। যদি কেউ জেনে-শুনে মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়, ইচ্ছাকৃতভাবে অন্যায় নম্বর দেয় এবং কোনো উকিল যদি স্রেফ পেশার দোহাই পেড়ে জেনে শুনে মিথ্যা ও অন্যায়ের পক্ষ সমর্থন করে, তবে সে ব্যক্তি নিঃসন্দেহে কবীরা গুনাহগার হবে।
অনুরূপভাবে জেনে-শুনে অযোগ্য নেতা নির্বাচনে সমর্থন দিলে ঐ ব্যক্তি ঐ নেতার যাবতীয় দুষ্কর্মের ভাগীদার হিসাবে গণ্য হবে। আদালতের সাক্ষ্য দানের ফলাফল সীমিত সংখ্যক লোকের উপরে বর্তায়। কিন্তু নেতৃত্ব নির্বাচনে সাক্ষ্য বা সমর্থন দানের তিনটি দিক রয়েছে। (১) সাক্ষ্য দান করা, (২) ব্যক্তিগত সুপারিশ করা, (৩) সামষ্টিক অধিকার সম্পর্কে ওকালতি করা। অর্থাৎ- আমার পক্ষ থেকে নেতা হলেন সমষ্টির দায়িত্ব প্রাপ্ত। এই তিনটি ক্ষেত্রে সৎ, যোগ্য ও আল্লাহভীরু নেতৃত্বকে সমর্থন দিলে নেতার যাবতীয় নেকীর কাজের সওয়াবের একটা অংশ যেমন সমর্থনদাতা পাবেন, তেমনি বিপরীতটা হলে তার মারাত্মক ফলাফলও সমর্থনদাতার ‘আমলনামায় লিপিবদ্ধ হবে। কারণ নেতার সঠিক বা বেঠিক সিদ্ধান্তের ফলাফল সমস্ত সমাজের উপরে পড়ে।
ইনসাফ ও ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা : সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন যে বিষয়টি, তা হলো- ইনসাফ ও ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠা। ইনসাফ ও ন্যায়বিচার হলো শান্তির চাবিকাঠি।
ইনসাফ ও ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠার উপায় : আলোচ্য আয়াতেই ইনসাফ ও ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠার উপায় বলে দেওয়া হয়েছে। সেটা হলো তাক্বওয়া বা আল্লাহভীতি। যার অর্থ কেবল মনে মনে মহান আল্লাহকে ভয় করা নয়; বরং তার অর্থ হলো- মহান আল্লাহর দেখানো পথে চলা এবং জীবনের সব স্তরে ওয়াহীর বিধান অনুসরণ করা।
আয়াতেরশিক্ষাসমূহ
এক- সকল পরিস্থিতিতেই মু’মিনদের উচিৎ ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়া।
দুই- স্বজনপ্রীতি, সংগঠন ও দলপ্রীতি সমাজে সাম্য-শান্তিপ্রতিষ্ঠার প্রধান অন্তরায়। সুতরাং সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য এসবের ঊর্ধ্বে উঠে সত্যিকারেরন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য তাক্বওয়াভিত্তিক ইসলামী সমাজগঠন সর্বাগ্রে প্রয়োজন।
তিন- মিথ্যাসাক্ষ্য একটি গর্হিত অপরাধ (এটা কবিরা গুনাহ)। দুনিয়া ও আখিরাতে শান্তি পেতে চাইলে এটা পরিত্যাগ করতেই হবে। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে মিথ্যাসাক্ষ্য পরিত্যাগ করে সত্য সাক্ষ্য প্রদানের সৎসাহস দান করুন!
চার- স্বজনপ্রীতির কোনো প্রয়োজন নেই। পিতা-মাতা, ভাই-বোন ও আত্মীয়স্বজনের প্রতি আমাদের সকলের চাইতে আল্লাহ তা‘আলাই বেশি শুভাকাংখী।
পাঁচ- পরিশেষে বলতে চাই, আমাদের মধ্যে যারা বিচারক, দলনেতা, সরকার ও ওলামায়ে কিরাম তারা সহ প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো সমাজে ইনসাফ ও ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠায় তাক্বওয়ার পথ অবলম্বন করা। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সকলকে এই পথে চলার তাওফীক্ব দিন -আমীন।
[১] সূরা আন্-নিসা : ১৩৫।
[২] সূরা আর-হাদীদ : ২৫।
[৩] সূরা আল-মায়িদাহ্ : ৮।
[৪] সূরাআল-বাক্বারাহ্ : ১৭০।
[৫] সূরাআল-বাক্বারাহ্ : ১৪৬।
[৬] সূরা বানীইস্রা-ঈল/ইস্রা : ২৬।
[৭] সূরা আত্-তাওবাহ্ : ১০০।
[৮] সূরা আ-লি-‘ইমরান : ১০৩।
[৯] সূরা আ-লি-‘ইমরান : ১০৫।
[১০] সূরা আ-লি-‘ইমরান : ১০২।
[১১] সূরা আন্-নিসা : ৮৫।

আপনার মন্তব্য1