ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু দিন থাকে, যেগুলো কেবল কালের ধারাবাহিকতায় নয়, হৃদয়ের গভীর প্রদেশে স্থায়ী রেখাপাত করে। আশুরা তেমনই এক দিন- মুহাররমের দশ তারিখ-যেটি ইসলামের ইতিহাসে স্মরণীয় ও বরণীয়।
বিশুদ্ধ হাদীস দ্বারা জানা যায় যে, আল্লাহ তা'আলা এই দিনে ফেরাউনকে ধ্বংস করেন এবং মুক্তি দেন নবী মূসা (আ.) ও তাঁর জাতিকে। ঘটনাচক্রে ৬১ হিজরি সনের এই দিনে কারবালা প্রস্তরে শাহাদাত বরণ করেন রাসূল (সা)-এর দৌহিত্র হুসাইন (রা.)-সহ অনেকে। যদিও ইসলাম স্বীকৃত আশুরা-ই মুহগ্রাম-এর সাথে কারবালার অনাকাঙ্খিত ঘটনার দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, ইসলামের এই মহিমান্বিত দিনটি আজ অনেকের কাছে একরকম 'ধর্মীয় উৎসব' বা 'আবেগের নাট্যমঞ্চ' হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর আবরণে ঢেকে গেছে পবিত্র সুন্নাহর স্বচ্ছ রূপরেখা, মুছে যেতে বসেছে সেই জ্যোতির্ময় দিকনির্দেশনা, এই দিন উপলক্ষে যা রাসূল (সা.) রেখে গেছেন।
আশুরা একটি আলোকবর্তিকার দিন। আলোকবর্তিকাময় এই দিনে রাসূলুল্লাহ (সা.) মদীনায় আগমনের পর দেখতে পান যে ইহুদিরা আশুরার এ দিনে সওম পালন করছে। কারণ, এ দিনেই আল্লাহ তা'আলা মূসা (আ)-কে ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, "আমরা মূসার অনুসরণে তোমাদের চেয়ে অধিক হক্বদার।" অতঃপর তিনি নিজে সওম রাখেন এবং সাহাবীদেরকেও সিয়াম পালনের নির্দেশ দেন। এভাবে আল্লাহর নবী ও তাঁর সাহাবীগণ প্রতি ১০ মুহারাম সিয়াম পালনে করে আসছিলেন। জনৈক সাহাবী বলেন: হে আল্লাহর রাসূল! এই দিন সেই দিন, যে দিনকে ইয়াহুদীরা সম্মান করে। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, "আমি বেঁচে থাকলে আগামী বছর ৯ তারিখ (সংযুক্ত করে) সওম পালন করব"। কিন্তু পরবর্তী আশুরা আসার আগেই মহানবী (স)-এর মহাপ্রয়াণ ঘটে। পরবর্তীতে এ নির্দেশনার আলোকে সাহাবীগণ ৯ ও ১০ দু'দিন সিয়াম পালন করতেন। যুগ পরম্পরায় এভাবেই আশুরার সিয়াম পালন হয়ে আসছে। অপর এক হাদীসে ১০ম তারিখের পূর্বাপর ১ দিন মিলিয়ে ২টি সিয়াম রাখার কথা এসেছে।
অর্থাৎ- আশুরা মূলত ছিল ঈমান, কৃতজ্ঞতা, আত্মসংযম এবং পূর্ববর্তী নবীদের পথ অনুসরণের এক নিখাঁদ অনুশীলন। কিন্তু যখন ধর্মীয় আবেগ সুন্নাহকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে, দুঃখজনকভাবে, তখন থেকে আশুরাকে ঘিরে এমনসব প্রথা ও আচরণ চালু হয়ে গেছে, যা ইসলামী শরীয়তের মূল উৎসে পরিলক্ষিত হয় না। কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের আড়ালে সমাজে গড়ে উঠেছে মাতম ও বুক চাপড়ানো, তলোয়ার বা জিঞ্জির দ্বারা শরীর রক্তাক্ত করা, দস্তারখান বা নিয়াজের নামে লোক দেখানো আয়োজন, মিছিল ও তাজিয়ার নামে অপব্যয় ও আনুষ্ঠানিকতা, আশুরার সঙ্গে সম্পৃক্ত নানা ভিত্তিহীন হাদীস ও গল্পগাঁথা।
এসব আচরণ শুধু ইসলামের রীতিবিরুদ্ধ নয়; বরং তা আঘাত হানে রাসূল (সা.)-এর সুন্নাহ ও সাহাবায়ে কেরামের শিক্ষা ও চর্চার মর্মে।
আশুরাকে কেন্দ্র করে সুন্নাহর অবমাননা আজ এমন পর্যায়ে উপনীত হয়েছে, যা পরিপূর্ণ আত্মিক বিপর্যয়। স্মর্তব্য যে, ইসলামে সুন্নাহ মানে কেবল 'একটি রেওয়াজ' নয়; বরং একটি পূর্ণাঙ্গ, সুশৃঙ্খল জীবনব্যবস্থা। আশুরার দিন যখন বিদআত প্রবল হয়, সুন্নাহ তখন অবদমিত হয়। লোকাচারের অতিরঞ্জন, মিথ্যাচার ও আবেগের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায় সে পবিত্র শিক্ষা, যা রাসূল (সা.) আমাদের দিয়ে গেছেন।
হুসাইন (রা.)'র শাহাদাত ছিল সত্য ও ন্যায়ের জন্য আত্মত্যাগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। কিন্তু তাঁর মৃত্যুতে আমরা যদি এমন কিছু করি, যা ইসলাম সমর্থন করে না, তবে তা হবে তাঁর আত্মত্যাগের আদর্শের অবমাননা।
অতএব এখনই সময় আশুরাকে ঘিরে আমাদের করণীয় নির্ধারণ করা। সত্যের পথে প্রত্যাবর্তন করা। আশুরা আমাদের স্মরণ করায়, সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকার অনন্য উদাহরণ। আমাদের উচিত বিদআত, কুসংস্কার ও লোকাচার থেকে সম্পূর্ণরূপে বিরত থাকা। কারবালার ঘটনাকে ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে, ধর্মীয় প্রজ্ঞায় মূল্যায়ন করা। সমাজকে শিক্ষিত করা, যেন ধর্মীয় আবেগে ভ্রান্তি না ঘটে। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শে, সাহাবায়ে কিরামের চর্চায় আশুরাকে ফিরিয়ে আনা। সর্বোপরি ৯-১০ অথবা ১০-১১ই মুহাররম সওম পালনের মাধ্যমে পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহ মার্জনার সুবর্ণ সুযোগ গ্রহণ করা।
পরিশেষে বলব, আশুরা আমাদের কাছে কেবল একটি দিন নয়; বরং একটি বাতিঘর- যা আমাদের ঈমানের নোঙর স্থির রাখে, আমাদের চিন্তা জাগ্রত করে এবং সত্যকে আঁকড়ে ধরার প্রেরণা দেয়। কিন্তু যখন সে বাতিঘর আবেগের ঘন কুয়াশায় ঢাকা পড়ে যায়, তখন পথ হারায় পথিক।
সুতরাং, সজাগ হই। সুন্নাহর দিকে ফিরে তাকাই। রাসূল (সা.)-এর প্রদর্শিত পথেই আশুরার মহত্বকে হৃদয়ে ধারণ করি। আত্মবিস্মৃত আবেগ নয়; বরং জ্ঞান, বিবেচনা ও আনুগত্য হোক আমাদের আশুরা পালনের প্রেরণা।
https://weeklyarafat.com

আপনার মন্তব্য1