আমাদের ধর্মীয় ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবনে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার গুরুত্ব অপরিসীম। সমগ্র মুসলিম জাহানের ধর্মীয় ও জাতীয় উৎসব হিসেবেও ঈদাইন তথা এ দুই ঈদ তাৎপর্যপূর্ণ। ঈদুল ফিতর আত্মসংযম ও সহমর্মিতার বার্তা নিয়ে আগমন করে এবং ঈদুল আযহার শিক্ষা হলো, আত্মত্যাগ ও আত্মোৎসর্গের মহান পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনের মাধ্যমে আত্মোৎকর্ষ সাধন। কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে আজ সর্বত্রই আত্মসংযম ও আত্মোৎসর্গের বিপরীত সুর অনুরণিত হচ্ছে। এজন্য জাতীয় কবি আফসোস করে বলেছেন,
“হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধন।”
‘কুরবানী’ উর্দু বা ফার্সি শব্দের আরবি রূপ হলো- ‘কুরবান’। যার মূল শব্দ قرب অর্থ হলো- ‘নৈকট্য’। পারিভাষিক অর্থে নির্ধারিত দিনসমূহে সুনির্দিষ্ট পশুগুলোর রক্ত প্রবাহিত করার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য বা সন্তুষ্টি লাভ করা। কুরবানীর প্রতিশব্দ হিসেবে نحر শব্দও ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন- আল্লাহ বলেন, فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ “সুতরাং তুমি তোমার প্রতিপালকের সমীপে সালাত আদায় এবং কুরবানী করো”। এ কারণে কুরবানীর দিনকে يوم النحر বলা হয়ে থাকে। আবার نسك শব্দটিও কুরবানীর প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, قُلْ إِنَّ صَلَاتِيْ وَنُسُكِيْ وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِيْ لِلّٰهِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ “আপনি বলুন, নিশ্চয় আমার সলাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন, আমার মৃত্যু সবই বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহ রব্বুল ‘আলামীনের জন্য”। অনুরূপ আল্লাহ তা‘আলা বলেন, لِكُلِّ أُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنْسَكًا “আমি প্রত্যেক উম্মাতের জন্য কুরবানীর বিধান দিয়েছি”। আবার الاضحى শব্দটি দ্বারাও কুরবানী বুঝানো হয়েছে। হাদীসের ভাষ্য মতে এজন্য কুরবানীর ঈদকে ঈদুল আযহা বলা হয়। আবার হাজী সাহেবগণ মিনা প্রান্তরে যে পশু যবেহ করেন তাকে ‘হাদী’ নামে অবহিত করা হয়।
কুরবানীর বিভিন্ন নামের তাৎপর্য বর্ণনা করতে গেলে কলেবর বৃদ্ধি পাবে, যা এই পরিসরে অপ্রাসঙ্গিক। তবে নাম যাই হোক, মূল উদ্দেশ্য, রক্ত প্রবাহিত করার মাধ্যমে মহান আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা।
মনের কোণে প্রশ্ন উঁকি দেয়, তবে কী অন্য কোনো ‘ইবাদতের মাধ্যমে মহান প্রভুর নৈকট্য অর্জন হয় না? দ্বিধাহীন চিত্তে বলতে হবে, সকল ‘ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য, “মহান রবের নৈকট্য অর্জন” এবং তাঁরই সন্তুষ্টি লাভের মাধ্যমে চিরস্থায়ী জান্নাতের অধিবাসী হওয়া।
তবে নৈকট্য লাভের ক্ষেত্রে কেন কুরবানী নামক ‘ইবাদতটি প্রাধান্য পেয়েছে? এই প্রশ্নটির জবাব প্রদানের একমাত্র হক্বদার মুসলিম জনক ইব্রা-হীম (আ)। কেননা প্রাণপ্রিয় পুত্রের গলায় ছুরি চালানোর মতো মহান আত্মত্যাগ পৃথিবীর ইতিহাসে কোনোদিন ঘটেনি, ভবিষ্যতেও কোনো দিন ঘটবে না। আমরা তো কেবল প্রতীকি কুরবানী করে গোশ্ত খাওয়ার উৎসবে মেতে উঠছি! কি করে বুঝব ‘আত্মত্যাগ’ কাকে বলে?
অতএব আমরা যতক্ষণ না পিতা ইব্রা-হীম (আ)-এর তাওহীদী চেতনা মনেপ্রাণে লালন, প্রতিপালন ও সম্পাদন করতে পারব, ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের কুরবানী মূল্যহীন থেকে যাবে, লাভ এতটুকুই যে উৎসবমুখর পরিবেশে গোশ্ত ভক্ষণ করা হবে।
অতএব আমরা যদি চাই, আমাদের কুরবানী কবূল হোক! তবে কুরবানীর পশুর রক্ত প্রবাহিত করার আগে শানিত ছুরির সামনে পেশ করতে হবে, হৃদয়ের গহীনে জমে থাকা বহুত্ববাদের বিশ্বাস, রিসালাতের পরিপন্থী চেতনা, আমিত্ব, আত্মগরিমা, অহংবোধ, পরশ্রীকতরতা এবং যাবতীয় পাপাচারকে; আর তখনই পশুর রক্ত প্রবাহিত করা স্বার্থক হবে।
আজ মুসলিম উম্মাহ্ সঙ্কটময় সময় অতিবাহিত করছে। ফিলিস্তিনের নিরীহ-নিরস্ত্র জনসাধারণের রক্ত নিয়ে হিংস্র-বর্বর ইহুদী-ইস্রাঈলীরা এক নোংরা খেলায় মেতে ওঠেছে। উগ্র হিন্দুত্ববাদের প্রতিহিংসার অনলে প্রতিনিয়ত জ্বলছে কাশ্মীরের মুসলিমগণ। আরাকানের মুসলিমগণ বৌদ্ধদের নির্মম নির্যাতনে ভিটেছাড়া। দেশে দেশে মুসলিম উম্মাহ আজ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার, মুসলিমদের পবিত্র রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে জনপদ। আমরাও নিরাপদে নেইÑ এখনই নিজের আমিত্ব, প্রভুত্ব, নেতৃত্ব, লিপ্সা, বিবেচনাহীন আকর্ষণ এবং দুনিয়া হাসিলের তীব্র তামান্না পরিত্যাগ করে ঐক্যবদ্ধ উম্মাহ গঠনে মনোযোগী না হলে অচিরেই এর খেসারত দিবে, অবস্থাদৃষ্টে তা স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হচ্ছে।
অতএব, আসুন! আমরা ‘দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনে’ সংহতি প্রকাশ করে, ১০ যুলহিজ্জায় রক্ত প্রবাহিতকরণের মধ্য দিয়ে ঐক্যবদ্ধ উম্মাহ গঠনে প্রতিশ্রম্নতিবদ্ধ হই এবং আওয়াজ তুলিÑ “হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধন।” নিশ্চয়ই সুমহান আল্লাহর সাহায্য আমাদের সন্নিকটেইÑ “আলা ইন্না নাসরাল্লা-হিল কারীব।”

আপনার মন্তব্য1