আল্লাহ তা‘আলার বাণী
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا کُتِبَ عَلَیۡکُمُ الصِّیَامُ کَمَا کُتِبَ عَلَی الَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِکُمۡ لَعَلَّکُمۡ تَتَّقُوۡنَ
সরল বাংলায় অনুবাদ
“হে বিশ্বাসীগণ! তোমাদেরকে সিয়ামের (রোযার) বিধান দেওয়া হলো যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীদের দেওয়া হয়েছিল। যাতে তোমরা তাক্বওয়া অর্জন করতে পার।”
বিষয়বস্তু ও অবতরণের প্রেক্ষাপট
দরসে বর্ণিত আয়াতটি সূরা আল বাক্বারাহ্’র ১৮৩ নং আয়াত। সূরা আল বাক্বারাহ্ কুরআনুল কারীমের একটি অতিদীর্ঘ সূরা। এ সূরাতে ইসলামী জীবন ব্যবস্থার প্রায় সকল দিক-নির্দেশনা রয়েছে। রয়েছে সালাত, সিয়াম ও যাকাতের বিধি-বিধান। এ সূরার অধিকাংশ আয়াত হিজরতের পর মদীনায় নবীজি (সা.)এর উপর অবতীর্ণ হয়। কয়েকটি আয়াত মক্কায় অবতীর্ণ হলেও বিষয়বস্তুর সামঞ্জস্যতার কারণে এ সূরায় এগুলো শামিল হয়েছে। এই সূরাটি মাদানী সূরা হিসেবে সর্বসম্মতভাবে গৃহীত।
আয়াতের সংক্ষিপ্ত তাফসীর
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا
অর্থ- “হে বিশ্বাসীগণ!”
কুরআনুল কারীমের একটি অসাধারণ বর্ণনা রীতি হলো- প্রয়োজন অনুসারে কোনো একটি বিশেষ সম্প্রদায় কিংবা সমগ্র মানবমণ্ডলীকে সম্বোধন করা। আলোচ্য আয়াতাংশে یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا “হে বিশ্বাসীগণ!” বলে মু’মিনদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই বুঝা যায় এখানে আল্লাহ সুবহা-নাহু তা‘আলা মু’মিনদেরকে একটি বিশেষ হুকুম (বিধান) দিতে চান। যা মু’মিনরা পালন করতে প্রস্তুত থাকবে। আমরা এ বিধান সম্পর্কে জানার পূর্বে মু’মিনদের পরিচয় জানার চেষ্টা করব। স্বয়ং আল্লাহ সুবহা-নাহু তা‘আলা মু’মিনদের পরিচয় দিচ্ছেন এভাবে-
اِنَّمَا الۡمُؤۡمِنُوۡنَ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا بِاللّٰهِ وَرَسُوۡلِهٖ ثُمَّ لَمۡ یَرۡتَابُوۡا وَجٰهَدُوۡا بِاَمۡوَالِهِمۡ وَاَنۡفُسِهِمۡ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ
অর্থ- “নিশ্চয়ই তারাই মু’মিন যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনে এবং তাতে তারা সন্দেহ পোষণ করে না। আর তারা জীবন ও সম্পদ দিয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা (যিহাদ) করে।”
সুতরাং বুঝা যায়, আল্লাহ সুবহা-নাহু তা‘আলা যখন মু’মিনদেরকে সম্বোধন করে কোনো বিধান নাযিল করেন। তখন মু’মিনরা এটিকে আল্লাহপ্রদত্ত বিধান বলে যথোপযুক্ত মূল্যায়ণ করতঃ তা পালন করাতে সর্বান্তকরণে চেষ্টা করে।
সিয়ামের বিধান : আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
کُتِبَ عَلَیۡکُمُ الصِّیَامُ
অর্থ- “তোমাদেরকে সিয়ামের (রোযার) বিধান দেওয়া হলো।”
সিয়ামের এ বিধানটি আল্লাহ তা‘আলা کُتِبَ শব্দটি দিয়ে আবশ্যিক করেছেন। চিন্তাশীলদের জন্য এখানে অনেক ভাবনার বিষয় লুকিয়ে আছে। এতে রয়েছে সিয়ামের বিশেষ গুরুত্ব ও তাৎপর্যের ইশারা। শব্দটি সিয়ামকে অনেক বেশি তাৎপর্যবহ করে অন্যান্য বহু নির্দেশ হতে এটিকে একটি ভিন্নমাত্রায় সংযোজন করেছে। এ বিধান শুধু আমাদের উপরেই নয়; বরং পূর্ববর্তীদের উপরেও অনুরূপ বিধান ছিল। আল্লাহ সুবহা-নাহু তা‘আলা বলেনÑ
کَمَا کُتِبَ عَلَی الَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِکُمۡ
“যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীদের দেওয়া হয়েছিল।”
এই বিধানটি হলোÑ সর্বজন বিধিত। এর মাধ্যমে বিধানটির গুরুত্ব বুঝানোর সাথে সাথে এটাও বুঝানো হয়েছে যে বিধানটি কঠিন হলেও পূর্ণরূপে আদায় করা সম্ভবপর।
صيا\صوم-এর সংজ্ঞা : صام‐يصوم-এর মাসদার হলোÑ صيا\صوم শাব্দিক অর্থ— বিরত থাকা। কেউ কেউ এর প্রমাণ হিসেবে কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতটি উপস্থাপন করেন।
إِنِّيْ نَذَرْتُ لِلرَّحْمَنِ صَوْمًا
অর্থ- “আমি দয়াময়ের উদ্দেশ্যে রোযা মানত করেছি।”
এখানে صَوْمًا শব্দটি কথা—বার্তা হতে বিরত থাকার অর্থে ব্যবহার হয়েছে। হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী صوم-এর আবিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ করেছেন নিম্নরূপ-
إمساك مخصوص فى زمن مخصوص من شيئ مخصوص بشرائط مخصوصة.
অর্থ- নির্দিষ্ট সময়ে সুনির্দিষ্ট শর্তাবলির ভিত্তিতে নির্দিষ্ট কতিপয় বস্তু হতে বিরত থাকার নাম রোযা।
আল্লামা রাগেব ইস্পাহানি ( ) বলেন : صوم শব্দের অর্থ হলোÑ কোনো কাজ হতে বিরত থাকা। এ জন্য যে ঘোড়া চলা হতে বিরত থাকে তাকে ‘সায়েম’ বলা হয়। পারিভাষিকভাবে صوم শব্দের অর্থ হলোÑ শরীয়তের দায়িত্বপ্রাপ্ত মুকাল্লাফ ব্যক্তি ফজর থেকে নিয়ে মাগরিব পর্যন্ত সময় নিয়তের সঙ্গে পানাহার ও যৌন কামনা বাসনা থেকে বিরত থাকা এবং ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করা হতে নিবৃত্ত থাকা।
শায়খ মুহাম্মাদ সালেহ আল উসাইমিন صوم বা রোযার সংজ্ঞা বর্ণনা করতে গিয়ে লেখেন,
هو التعبد لله سبحانه وتعالى بالإمساك عن الأكل والشرب وسائر المفطرات من طلوع الفحر إلى غروب الشمس.
সুবেহ সাদেক থেকে নিয়ে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময় পানাহার ও সর্বপ্রকার রোযা ভঙ্গকারী বস্তু হতে বিরত থাকার মাধ্যমে ‘ইবাদত করাকে রোযা বলে অভিহিত করা হয়।
তাক্বওয়ার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা : আয়াতের শেষাংশে لَعَلَّکُمۡ تَتَّقُوۡنَ বলে সিয়ামের মূল লক্ষ্য হিসেবে স্থীর করা হয়েছে তাক্বওয়া অর্জনকে। একজন মু’মিনের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে তাক্বওয়া রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক। তাক্বওয়া মানুষকে সম্মানিত করে। আল্লাহ সুবহা-নাহু তা‘আলা বলেন-
إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللهِ أَتْقَاكُمْ
অর্থাৎ-“নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সেই সম্মানিত যার মধ্যে বেশি তাক্বওয়া রয়েছে।” আর এই তাক্বওয়া যার মধ্যে রয়েছে আল্লাহ সুবহা-নাহু তা‘আলা ধারণাতীত উৎস থেকে তার রিয্কের ব্যবস্থা করে দেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন-
وَمَن يَتَّقِ اللهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ
অর্থাৎ- “আর যে তাক্বওয়ার পথে চলে আল্লাহ তার জন্য জীবন চলার পথ বের করে দেন আর ধারণাতীত জায়গা থেকে তার রিয্কের ব্যবস্থা করেন।”
যারা এই তাক্বওয়া অর্জন করে আল্লাহ তা‘আলা তাদের যাবতীয় কাজ-কর্ম সহজ করে দেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন-
وَ مَنۡ یَّتَّقِ اللّٰهَ یَجۡعَلۡ لَّهٗ مِنۡ اَمۡرِهٖ یُسۡرًا
অর্থাৎ- “আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার কাজ সহজ করে দেন।”
যারা ঈমান ও তাক্বওয়া অবলম্ভন করে চলে তাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা উভয় জগতের সুসংবাদ দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন-
الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَ کَانُوۡا یَتَّقُوۡنَ— لَهُمُ الۡبُشۡرٰی فِیْ الۡحَیٰوْۃِ الدُّنۡیَا وَ فِی الۡاٰخِرَۃِ
অর্থাৎ- “আর যারা ঈমান ও তাক্বওয়া অবলম্ভন করে চলে তাদের জন্য রয়েছে দুনিয়া ও আখিরাতের সুসংবাদ।”
মুত্তাক্বীদের জন্য আল্লাহ তা‘আলা জান্নাত তৈরি করে রেখেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন-
وَجَنَّةٍ عَرۡضُهَا ٱلسَّمٰوٰتُ وَٱلۡأَرۡضُ أُعِدَّتۡ لِلۡمُتَّقِيْنَ
অর্থাৎ- “আর জান্নাত, যার প্রশস্ততা আকাশ-পৃথিবীর সমান এটি আল্লাহ মুত্তাক্বীদের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছেন।” আর আল্লাহ সুবহা—নাহু তা‘আলা এই তাক্বওয়া অর্জনের সুযোগ করে দিয়েছেন বিভিন্ন ‘ইবাদতের মাধ্যমে। যেমন-সলাতের মাধ্যমে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন-
وَ اۡمُرۡ اَهۡلَکَ بِالصَّلٰوۃِ وَ اصۡطَبِرۡ عَلَیۡهَا لَا نَسۡـَٔلُکَ رِزۡقًا نَحۡنُ نَرۡزُقُکَ وَ الۡعَاقِبَۃُ لِلتَّقۡوٰی
অর্থাৎ-“আর তোমার পরিবার-পরিজনকে নামাযের নির্দেশ দাও এবং তাতে অবিচল থাকো, আমি তোমার কাছে রিয্ক চাই না; বরং তোমকে আমি রিয্ক দেই আর শেষ পরিণাম তো তাক্বওয়া অর্জনকারীর।”
কুরবানিতেও রয়েছে তাক্বওয়ার পরিক্ষা : আল্লাহ তা‘আলা বলেনÑ
لَنۡ یَّنَالَ اللّٰهَ لُحُوۡمُهَا وَ لَا دِمَآؤُهَا وَ لٰکِنۡ یَّنَالُهُ التَّقۡوٰی مِنۡکُمۡ
অর্থাৎ- “আল্লাহর কাছে কুরবানির পশুর গোশ্ত ও রক্ত পৌঁছায় না পৌঁছায় তোমাদের তাক্বওয়া।”
এই তাক্বওয়া অর্জনের সূবর্ণ সুযোগ রয়েছে মাহে রমাযানে।
তাক্বওয়ার সংজ্ঞা : তাক্বওয়া শব্দটি আরবী وقي মূলধাতু থেকে নেওয়া হয়েছে। যার অর্থ বেঁচে থাকা, ভয় করা, সাবধান হওয়া। তাক্বওয়া বলতে আল্লাহ ভীতিকে বুঝায়। তাই মহান আল্লাহর ভয় ও তাঁর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে যাবতীয় নাফরমানি থেকে বেঁচে থাকার নামই তাক্বওয়া।
উবাই ইবনু কা’ব (রা.) বর্ণনা করেন, ‘উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) উবাই ইবনু কা’ব (রা.)-এর কাছে তাক্বওয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আপনি কী কণ্টকাকীর্ণ পথে চলেন? তিনি জবাবে বলেন, হ্যাঁ। উবাই ইবনু কা’ব (রা.) বলেন, ‘তখন আপনি কিভাবে চলেন? তিনি বলেন, খুব সতর্কতার সঙ্গে কাঁটার অঁাচড় থেকে শরীর ও কাপড় বাঁচিয়ে চলি। উবাই ইবনু কা’ব (রা.) বলেন, এটাই তাক্বওয়া।’
মুত্তাকীর পারিভাষিক সংজ্ঞায় কাযী নাসিরুদ্দীন বায়যাবী (রা.) বলেন, “শরীয়তের পরিভাষায় মুত্তাকী বলা হয় ঐ ব্যক্তিকে যিনি নিজেকে এমন সব কিছু থেকে রক্ষা করেন, বাঁচিয়ে রাখেন, যা তাকে পরকালে ক্ষতির সম্মুখিন করবে।”
আবূ মুহাম্মদ আল হুসাইন ইবনু মাস‘ঊদ আল বগবী (রা.) বলেন, “মুত্তাকী ঐ ব্যক্তি, যিনি শির্ক, কবীরা গুনাহ ও সকল প্রকার অশ্লীলতা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখেন। মুত্তাকী শব্দটি আল ইত্তিকাউ থেকে নির্গত। এর প্রকৃত অর্থ হচ্ছে দু’বস্তুর মাঝখানের অন্তরাল-দেয়াল। যেমন- এক হাদীসে আছেÑ সাহাবায়ে কিরামের উক্তি, “যুদ্ধক্ষেত্রে প্রচণ্ড যুদ্ধ শুরু হলে আমরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে আড়াল করে থাকতাম। অর্থাৎ- যখন যুদ্ধের তীব্রতা বেড়ে যেত তখন আমরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে আমাদের ও শুক্রদের মাঝখানে অন্তরায় করে রাখতাম। সুতরাং মুত্তাকী মহান আল্লাহর আদেশ পালন এবং তাঁর নিষেধাজ্ঞা থেকে বিরত থাকাকে তার এবং মহান আল্লাহর শাস্তির মাঝখানে অন্তরায় তৈরি করে বলেই তাকে মুত্তাকী বলা হয়।
আল্লামা জারুল্লাহ যামাখশারী (র.) বলেন, “ইসলামী শরীআতের পরিভাষায় মুত্তাকী হলো ঐ ব্যক্তি, যে নিজ সত্তাকে রক্ষা করে এমন বিষয় থেকে, যার জন্য সে শাস্তির উপযোগী হয়ে যায়; সেটি করণীয় হোক বা বর্জনীয়।
ইমাম গাজালি (র.)-এর মতে, মহান আল্লাহকে ভয় করে যাবতীয় মন্দ ও খারাপ কাজ বর্জন করে যাবতীয় ভালো ও উত্তম কাজকে নিজের জীবনে গ্রহণ করার নামই তাক্বওয়া।
রমাযানে তাক্বওয়া অর্জনের সূবর্ণ সুযোগ : সংযম ও আত্মনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তাক্বওয়া অর্জন ও মহান প্রভুর সান্নিধ্য ও সন্তোষ অর্জনের সুবর্ণ সুযোগ নিয়ে আগমন করে সিয়াম সাধনার মাস পবিত্র রমাযান। একটু সচেতন হলেই এই মাসে আমরা তাক্বওয়ার অনুশীলন করতে পারি। তাক্বওয়া মানুষকে পাপ থেকে দূরে রাখে এবং সৎকাজে অনুপ্রাণিত করে। তাক্বওয়া অর্জনের জন্য যে সকল বিষয়গুলো খুবই জরুরি সে সকল বিষয়গুলোই আমরা মাহে রমাযানে প্রতিনিয়ত করে থাকি। নিম্নে তার কয়েকটি উপস্থাপন করা হলো-
জীবন বদলের দৃঢ় সংকল্প : তাক্বওয়া অহংকারী মানুষকে বিনয়ী করে। পাপত্মাকে পূণ্যাত্মায় পরিবর্তীত হতে উদ্বোদ্ধ করে। মাহে রমাযানে আমরা একটু চেষ্টা করলেই বিনয়ী ও পূণ্যবান হতে পারি। জীবন বদলের দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করতে পারি। রমাযান এলে আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সমস্ত ক্রিয়া-কর্মের রুটিনই তো পরিবর্তন করে থাকি। রমাযানের রুটিনটি যদি আমরা সবসময় অনুসরণ করি তবেই তো আমরা আমাদের জীবন বদলাতে পারব। চলতে পারব তাক্বওয়ার পথে। আসুন! সামনের রমাযান থেকেই আমরা আমাদের জীবন বদলের চেষ্টা করি।
পাপাচার ও সীমালংঘন মুক্ত জীবনের অনুশীলন : মাহে রমাযানে আমরা পাপাচার ও সীমালংঘন মুক্ত জীবনের অনুশীলন করে থাকি। কেননা পাপাচারে লিপ্ত থেকে সিয়াম সাধনা করলে সে সিয়াম আল্লাহ তা‘আলা গ্রহণ করেন না। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-
مَنْ لَمْ يَدَعْ قَوْلَ الزُّوْرِ وَالْعَمَلَ بِهِ فَلَيْسَ لِلّٰهِ حَاجَةٌ فِيْ أَنْ يَدَعَ طَعَامَهُ وَشَرَابَهُ.
অর্থাৎ- যে ব্যক্তি মিথ্যা বলা এবং সে অনুযায়ী কাজ করা ছাড়তে পারল না তার খাদ্য—পানাহার ছাড়ার কোনো প্রয়োজন নেই।
পাপ ছেড়ে দিয়ে আমরা যেমন- সিয়াম সাধনা করি। ধারাবাহিকভাবে সবসময়ে এটি অনুশীলনের মাধ্যমে আমরা পরিশুদ্ধতা অর্জন করতে পারি, যা তাক্বওয়া অর্জনের মূল সহায়ক।
ইখলাসের সঙ্গে মহান আল্লাহর ‘ইবাদত করা : ইখলাসের সঙ্গে মহান আল্লাহর ‘ইবাদত মানুষকে মুত্তাক্বী বানায়। মাহে রমাযানে আমরা তো ইখলাসের সঙ্গে অনেক ‘ইবাদত করে থাকি। যেমন- সিয়াম সাধনা, ক্বিয়ামুল লাইল (তারাবী বা তাহাজ্জুদ) ও লাইলাতুল ক্বদর উদ্যাপন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-
مَنْ صَامَ رَمَضَانَ، إِيْمَانًا وَاحْتِسَابًا، غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدّمَ مِنْ ذَنْبِهِ.
অর্থাৎ-যে ব্যক্তি ঈমান ও ইহতিসাবের সাথে (তথা ঈমান ও ইখলাসের সাথে সওয়াবের আশায়) রমাযানের রোযা রাখবে, তার অতীত গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।
তিনি আরো বলেন-
مَنْ قَامَ رَمَضَانَ إِيْمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ.
অর্থাৎ- যে ব্যাক্তি রমাযানে সওয়াবের আশায় রাত জেগে ‘ইবাদত করে, তার পূর্বের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।
তিরি আরো বলেন-
مَنْ قَامَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ إِيْمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ.
অর্থাৎ- যে ব্যাক্তি লাইলাতুল ক্বদরে ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় রাত জেগে ‘ইবাদত করে, তাঁর পিছনের সমস্ত গুনাহ মাপ করা হবে। আর যে ব্যাক্তি ঈমানসহ সওয়াবের আশায় রমাযানে সিয়াম পালন করবে, তাঁরও অতীতের সমস্ত গুনাহ মাফ করা হবে।
এই রকম সবসময় যদি আমরা আমাদের ‘ইবাদতগুলো ইখলাসের সাথে করে থাকি তাহলেই আমরা চলতে পারব তাক্বওয়ার পথে।
আয়াতের শিক্ষাসমূহ
এক. কুরআন শিক্ষা করা : রমাযান মাসের একটি বৈশিষ্ট্য হলোÑ এ মাসে আল্লাহ তা‘আলা কুরআন নাযল করেছেন। কুরআন হলো মুত্তাক্বীদের পথপ্রদর্শক। এ মাসে প্রায় সকল মুসলিমই কুরআন পাঠের চেষ্টা করে। বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত এ মাসের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। এই কুরআন পাঠ থেকে যদি আমরা শিক্ষা নিয়ে নিজেদের জীবন পরিচালনা করতে পারি তাহলেই আমরা মুত্তাক্বী হতে পারব।
দুই. জাগতিক লোভলালসা উপেক্ষা করার শিক্ষা : মুত্তাক্বীদের বৈশিষ্ট্য হলোÑ ওরা জাগদিক লোভ-লালসা উপেক্ষা করে সদা-সর্বদা হিদায়াতের উপর অবিচল থাকার চেষ্টা করে। রোযাদার ব্যক্তিগণও সারাদিন জাগতিক লোভলালসার উর্ধে থেকে সিয়াম সাধনা করে। সুতরাং রোযাদারদের পক্ষে তাক্বওয়ার পথে চলা সহজ।
তিন. সুবিচার বা ইনসাফ : পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,
“তোমরা সুবিচার করো। কেননা তা তাক্বওয়ার নিকটবর্তী।”
আমরা যদি মাহে রমাযান থেকে দুঃস্থ অসোহায় মানুষের ক্ষুধার যন্ত্রণা উপলব্ধি করে তাদের উপর ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে পারি। তবেই তো আমরা আমাদের কাংখিত সেই তাক্বওয়া অর্জন করতে পারব।
হে আল্লাহ! এই রমাযান মাসে আপনি আমাদের যাবতীয় ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করুন। আল-কুরআনের শিক্ষায় তাক্বওয়া অবলম্বন করত জান্নাতের পথে চলার তাওফীক্ব দান করুন Ñআমীন, সুম্মা আমীন।

আপনার মন্তব্য1